বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ও ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট বিল গেটসের দাতব্য সংস্থায় অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সঙ্গে যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সম্পর্কের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পর এই সিদ্ধান্ত নিলেন বাফেট।

২০০৬ সালে বাফেট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি জীবদ্দশায় প্রতিবছর বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ার বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনকে দান করবেন। তবে সম্প্রতি কয়েক শ কোটি ডলার মূল্যের শেয়ার দানের যে ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, সেখানে গেটস ফাউন্ডেশনের নাম অন্তর্ভুক্ত নেই। এর পরিবর্তে ওই শেয়ার বাফেট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি ফাউন্ডেশনের মধ্যে বণ্টন করা হবে।

৯৫ বছর বয়সী বাফেট জানিয়েছেন, আগামী ৮ বছরের মধ্যে তাঁর হাতে থাকা বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের অবশিষ্ট সব শেয়ার দান করে দেবেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের কবে মৃত্যু হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। যেভাবেই হোক, ২০৩৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আমার বাকি সব শেয়ার ওই চার ফাউন্ডেশনকে দান করে যাব।’

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করলে বিল গেটসের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসে। এর ছয় মাস পর বাফেট এই সিদ্ধান্ত নিলেন। যদিও দানসংক্রান্ত বিবৃতিতে বাফেট বিল গেটস বা জেফরি এপস্টিনের নাম উল্লেখ করেননি, তবে মার্চে সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয় প্রকাশিত হওয়ার পর বিল গেটসের সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি।’

বাফেট আরও বলেন, ‘আমি এমন পরিস্থিতিতে পড়তে চাই না। ধরুন, আমি অনেক কিছু জানি এবং সে জন্য আমাকে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হবে।’

গত ২০ বছরে বাফেট গেটস ফাউন্ডেশনকে মোট ৪৭ বিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। এই বিষয়ে গেটস ফাউন্ডেশন বিবিসিকে জানিয়েছে, ওয়ারেন বাফেট গত কয়েক দশক ফাউন্ডেশনের কাজে সহায়তা করেছেন, সে জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। ফাউন্ডেশন আরও জানায়, বিল গেটস ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতির দিয়েছেন, তার কল্যাণে ফাউন্ডেশন আর্থিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। এই বাস্তবতায় ২০৪৫ সাল পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে সংস্থাটি।

জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জবাব দিতে গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির সামনে হাজির হন বিল গেটস। উল্লেখ্য, নারী পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত জেফরি এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

কমিটির সামনে জবানবন্দিতে গেটস বলেন, ২০১১ সালে এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। যারা পরিচয় করিয়ে দেন, তারা ধারণা দিয়েছিলেন যে গেটস ফাউন্ডেশনের স্বাস্থ্য খাতের অনুদান সংগ্রহে এপস্টিন সহায়তা করতে পারেন। গেটস বলেন, ‘আমি জানতাম, এপস্টিনের বিরুদ্ধে আগে কিছু আইনি অভিযোগ ছিল। কিন্তু তিনি যে এমন ভয়াবহ অপরাধ করেছেন, তা বুঝতে পারিনি।’ ২০০৮ সালে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীকে যৌনকর্মে প্রলুব্ধ করা এবং ১৮ বছরের কম বয়সী আরেকজনকে যৌনকর্মে যুক্ত করার অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন এপস্টিন।

গেটস কমিটিকে বলেন, ‘প্রথম থেকেই আমার এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করা উচিত হয়নি। এখন যা জানি, তাতে বুঝতে পারছি—তিনি প্রতিশ্রুত অনুদানদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি।’

একসময় বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের বড় সমর্থক ছিলেন ওয়ারেন বাফেট। ২০০৬ সালে তিনি সংস্থাটির কার্যক্রমকে প্রশংসনীয় বলে অভিহিত করে প্রতিবছর অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০১০ সালে বাফেট, বিল গেটস ও মেলিন্ডা গেটস মিলে ‘গিভিং প্লেজ’ উদ্যোগ চালু করেন, যার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের অতিধনীদের সম্পদের অধিকাংশ দান করতে উৎসাহিত করা।

২০২১ সালে ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন বিল ও মেলিন্ডা গেটস। এরপর ২০২৪ সালে মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে সরে দাঁড়ান, তবে দাতব্য কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে নারীর অধিকার উন্নয়নে ১০০ কোটি ডলার অনুদান দেবেন তিনি।