বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা খেলাপি ঋণ। তবে সমস্যাটি নতুন নয়, বরং নতুন হচ্ছে তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি। গত এক দশকে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং সময় বাড়ানোর মতো নানা ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়া হলেও বাস্তবে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা সম্ভব হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ১৮ মাসের এক্সিট প্ল্যান বা প্রস্থান পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বের দাবি রাখে। এই পরিকল্পনায় ঋণ পুনর্গঠন, দ্রুত ঋণ আদায়, কঠোর তদারকি, ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন, ব্যাংক রেজোল্যুশন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের মতো পদক্ষেপ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে কেবল আসল টাকা পরিশোধ করলে সুদ মওকুফের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনা কি অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি এটি হবে একটি নতুন সূচনা?

অর্থনীতির মৌলিক শিক্ষা অনুযায়ী, কোনো সংকট দীর্ঘকাল অস্বীকার করলে তার সমাধানের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও তাই ঘটেছে। বছরের পর বছর পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে কাগজে-কলমে আর্থিক অবস্থাকে সুস্থ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষতির রূপ নিয়েছে।

বর্তমান এক্সিট প্ল্যানের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এককালীন নিষ্পত্তিতে সম্পূর্ণ সুদ মওকুফ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বা উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই তাদের জন্য নতুন করে শুরু করার সুযোগ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে এখানে বড় প্রশ্ন হলো, এই ক্ষতির মূল্য কে বহন করবে? ব্যাংক আমানতকারীর অর্থ ঋণ দেয়, তাই সুদ মওকুফের অর্থ হলো ব্যাংকের সম্ভাব্য আয় কমিয়ে দেওয়া। এই ঘাটতি পূরণে সরকারি অর্থ ব্যবহৃত হলে তার বোঝা করদাতাদের ওপর পড়বে। ফলে ঋণ পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, কেবল ঋণ পুনঃতফসিল বা সুদ মওকুফে ব্যাংকিং সংকট দূর হয় না। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর দক্ষিণ কোরিয়া ‘কোরিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন’ বা ক্যামকো গঠন করে ব্যাংকগুলোর সমস্যাগ্রস্ত ঋণ কিনে নিয়ে দ্রুত পুনর্গঠন ও সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনে এবং ব্যয়ের বড় অংশ পুনরুদ্ধার করে। মালয়েশিয়ার দানাহার্তাও সফল উদাহরণ, যার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত, দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ায় দুর্বল সুশাসন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে এএমসি গঠন করেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, সমস্যা কেবল ঋণের পরিমাণ নয়, বরং ঋণ-সংস্কৃতি। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা বিশেষ সুবিধার প্রত্যাশা করলে বাজারে ভুল প্রণোদনা তৈরি হয়, যা সৎ ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত করে। এই সংস্কৃতি পরিবর্তন না করে কেবল নতুন নীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ফল পাওয়া কঠিন। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এখন ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও সংস্কারের সঙ্গে তাদের আর্থিক সহায়তাকে সরাসরি যুক্ত করেছে, ফলে বাস্তবায়নের চাপ বেড়েছে।

"বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন একটি বিরল সুযোগ এসেছে। এ সুযোগ কেবল খেলাপি ঋণের হিসাব কমানোর নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের। কারণ, একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিও টেকসই হয় না।"

ইতিহাস বলে, আমাদের পরিকল্পনার অভাব ছিল না, ছিল বাস্তবায়নের অভাব। তাই ১৮ মাস পর এই এক্সিট প্ল্যানের মূল্যায়ন কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, বরং প্রকৃত পরীক্ষার মাধ্যমে হতে হবে। প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ, ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতি স্বীকারের সাহস এবং রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। কারণ, খেলাপি ঋণের সংকট কেবল অর্থের নয়, বরং এটি আস্থা, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরীক্ষা।

— মামুন রশীদ, ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক