রাজধানীর জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনার মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর মূলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এই সংকট উত্তরণে তিনি ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ বা নগর সরকার ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

বুধবার গুলশানে নগর ভবনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আয়োজিত ‘নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আমার, আপনার, সকলের দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, "নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে এক জায়গা থেকে নির্দেশ দিয়ে কাজ করানো বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।"

সেমিনারে তিনি আরও বলেন, "নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যার কাছে থাকার কথা, তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো নেই। ট্রাফিক পুলিশ, ওয়াসা, রাজউক, বিদ্যুৎ বিভাগ—কোনোটিই সিটি করপোরেশনের অধীন নয়। অথচ নগরের যেকোনো সমস্যার জন্য দায়ী করা হয় মেয়র বা প্রশাসককে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে ‘সিটি গভর্নমেন্ট’-এর দাবি রয়েছে। এসব সংস্থা সিটি করপোরেশনের অধীন এলে শতভাগ না হলেও ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব।"

সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, "সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডাকলে সবাই আসেন না, আবার কাউকে বাধ্যও করা যায় না।"

তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিভাগ, রাজউক বা পুলিশ ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় সমন্বয় করতে গিয়ে আইনি কর্তৃত্বের অভাব দেখা দেয়। এই কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল সভা-সেমিনারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মীর শাহে আলম জানান, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ (ওয়েস্ট টু এনার্জি) বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৮ সালের জুলাই-আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৪৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে, যারা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, জৈব সার, মাছ ও মুরগির খাদ্য, জ্বালানি তেল এবং নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব প্রকল্পে সরকারের কোনো বিনিয়োগ লাগবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

রাজধানীর লেক ও খালের দূষণের জন্য অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশনকে দায়ী করে প্রতিমন্ত্রী জানান, দাশেরকান্দি পয়োনিষ্কাশন শোধনাগার (এসটিপি) নির্মাণ হলেও প্রয়োজনীয় লাইন না থাকায় এর মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে হাতিরঝিল, গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার লাইন ওই শোধনাগারের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় ছোট আকারের এসটিপি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শুধু রাষ্ট্র বা সিটি করপোরেশনের প্রচেষ্টায় নগর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা রোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য আগামী বছরের পাঠ্যপুস্তকে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক দায়িত্ববোধসংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীর ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, "অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কয়েক শ বছরের পুরোনো একটি নগরকে অল্প সময়ে পরিকল্পিত নগরে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। তবে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।"

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকসহ অন্যান্যরা।