দেশের দীর্ঘ দুর্যোগের ইতিহাসে বন্যা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিবছরই জনজীবন বিপর্যস্ত করে। এমন পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, পরীক্ষা স্থগিত বা ক্লাস বাতিলের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও এর ফলে শিক্ষার যে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, সেই ক্ষতির হিসাব রাখা হয় না।

চলতি বছরের জুলাই মাসেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে। টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিলেও হাজারো পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। পরীক্ষার নতুন সূচি, ফল প্রকাশ এবং পরবর্তী একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাধারণত দুর্যোগের পর ঘরবাড়ি বা সড়কের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান সামনে এলেও কত শিক্ষার্থীর পরীক্ষা পিছিয়ে গেল বা কতজনের উচ্চশিক্ষা ও চাকরির পরিকল্পনা বিলম্বিত হলো, তা নিয়ে আলোচনা হয় না। অথচ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এক মাসের বিলম্বও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষা স্থগিত হলে পুরো একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রভাবিত হয়, যার ফলে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় লাগে। এটি ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি দেশের উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ইউনেসকো দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করার কথা বলে আসছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালেই জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও স্কুল বন্ধ ছিল, কোথাও শ্রেণিকক্ষ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, আবার কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে দুর্যোগ এখন শিক্ষা পরিকল্পনার একটি স্থায়ী বাস্তবতা।

করোনা মহামারির অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল মূল্যায়ন এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রীর মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব। তবে ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের অভাবে বঞ্চিত হয়েছিল, তাই প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

দুর্যোগের সময় শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস স্থগিত হলেও শিক্ষক ও কর্মচারীদের অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত অফিস করতে হয়। তবে শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এই সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আগাম একাডেমিক পরিকল্পনা, নমনীয় পরীক্ষা সূচি এবং দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া সব অঞ্চলের জন্য একই সিদ্ধান্ত না নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।

দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে পরিকল্পনা এমন হতে হবে যেন দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা যায়। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আজ যে শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আগামীকাল সে-ই হবে দেশের চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা প্রশাসক। তার শিক্ষাজীবনের বিলম্ব সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নকেও প্রভাবিত করে।

নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেলেও সংকটের মধ্যেও শিক্ষা চালিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিচয়। আগাম পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, নমনীয় একাডেমিক ক্যালেন্ডার এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার কৌশল এখন অপরিহার্য। ভেঙে যাওয়া সেতু বা সড়ক মেরামত করা গেলেও শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের সময় শিক্ষা খাতকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

দুর্যোগে শিক্ষা থেমে যাওয়ার ক্ষতি কেবল একজন শিক্ষার্থী বা প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের। আজকের শ্রেণিকক্ষেই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মিত হচ্ছে, তাই সেই ভিত্তি যেন অপ্রস্তুত অবস্থায় থেমে না যায়, সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের অঙ্গীকার।

— লেখক: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) ও শিক্ষানবিস আইনজীবী।