সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন ১০ লাখের বেশি মানুষ। তবে বন্যার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

মুক্তকণ্ঠের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় এ পর্যন্ত ৫১টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল, যার দক্ষিণ অংশ এখন কার্যত অবরুদ্ধ। একের পর এক এলাকা প্লাবিত হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার অনেক গ্রাম এখনো কোমরপানির নিচে তলিয়ে আছে। বন্যাকবলিত এসব এলাকায় বর্তমানে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাশাপাশি পার্বত্য তিন জেলা ও কক্সবাজারেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ভারী বৃষ্টি এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ এবং উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত রোববার পর্যন্ত পাহাড়ধস, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে পাহাড়ধসের কারণে। একের পর এক পাহাড়ধস ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা ছাড়া নাগরিকদের প্রাণ রক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতি দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতা এবং আমলানির্ভর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।

বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আশ্রয়শিবির খোলা হলেও অনেকে ত্রাণ পাননি। ক্ষতিগ্রস্তদের বিপরীতে বরাদ্দের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাত জেলায় নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যার মাথাপিছু পরিমাণ মাত্র ২৮ টাকা। চাল বরাদ্দ করা হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন, যা মাথাপিছু ৩ দশমিক ২ কেজি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও সিলেট অঞ্চলে পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা রয়ে গেছে। এই মুহূর্তে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় নগদ সহায়তা, চাল, রান্না করা ও শুকনা খাবার, শিশুখাদ্য, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং খাওয়ার স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বাড়ানো জরুরি। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, তা যেন প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। এছাড়া পানি সরে যাওয়ার পর ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ ঠেকাতে চিকিৎসা সহায়তা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট হচ্ছে। অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, যা আশ্রয়শিবির ছেড়ে বাড়ি ফেরার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা সরকারের জন্য এখন জরুরি।

একটা সময়ে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে ব্যাপক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যেত। তবে বর্তমানে এ ধরনের মানবিক তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সরকারের পাশাপাশি করপোরেট সংস্থা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যা সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।