বিশ্বকাপ ফুটবল যত এগিয়ে চলছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং এর নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তত প্রকট হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে এক মার্কিন ফুটবলারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি মিসর ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতি রেফারিদের পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে।
তবে ফিলিস্তিনের অভিজ্ঞতা আরও দীর্ঘ ও তিক্ত। দীর্ঘ সময় ধরে ফিফার আচরণকে পক্ষপাতদুষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে দেখছে ফিলিস্তিন। ফিফার নিজস্ব সংবিধানে মানবাধিকার রক্ষার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও ফিলিস্তিনি ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই নীতির কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বারবার দাবি জানিয়েছে যেন ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে নিষিদ্ধ করা হয়। তাদের অভিযোগ, ইসরায়েলি লিগের ম্যাচগুলো এমন জমিতে অনুষ্ঠিত হয় যা দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনকারী দলগুলো অংশ নেয়। কিন্তু ফিফা প্রতিবারই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের ওপর গণহত্যা, পঙ্গু করা এবং আটকের মতো গুরুতর ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধেও নীরব থেকেছে ফিফা। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি নারী ফুটবল দলের সদস্য র্যান্ড হালাওয়ানি এবং নাতালি আবু দায়্যেহ আটক হওয়া সত্ত্বেও সংস্থাটি কোনো প্রতিবাদ জানায়নি। এমনকি ফিলিস্তিনের ফুটবল স্টেডিয়াম ধ্বংস করা হলেও ফিফার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যাতায়াতের অনুমতি না দেওয়া সহ নানা প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ফুটবলকে বাধাগ্রস্ত করা হলেও ফিফা কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি।
ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কেবল বর্ণবাদ ও দখলদারিকে স্বাভাবিক করেনি, বরং গাজা ও লেবাননে যুদ্ধাপরাধে যুক্ত ইসরায়েলি ফুটবলারদের অংশগ্রহণকে অভিনন্দন জানানোর মতো কাজেও যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় এবং জাতিসংঘের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ফিফা দাবি করে আসছে যে, এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘অত্যন্ত জটিল’ এবং পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি। বাস্তবে এটি ইসরায়েলের বক্তব্যকেই সমর্থন করা, যা ট্রাম্প প্রশাসনও তাদের মিত্র ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এবং ফিলিস্তিনি জমি দখলকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করেছে।
"ফিফা যে আর নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা নেই, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।"
ইসরায়েল যেমন পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম বা কৃষিকে ব্যবহার করে অবৈধ দখলদারি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে, ফিফার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে ফুটবলকেও সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার এই ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ জানিয়েছে। তাদের দাবি, তিনি জেনেশুনে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবৈষম্য এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত কাজ করেছেন এবং এ বিষয়ে একাধিক রিপোর্ট ও চিঠি উপেক্ষা করেছেন।
ফিফার নেতৃত্ব কেবল নিষ্ক্রিয় থাকেনি, বরং সক্রিয়ভাবে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করেছে। গত মাসে অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব দেয় ফিফা। তার কয়েক সপ্তাহ আগে ইনফান্তিনো নিজে ফিলিস্তিনি ফুটবল সংস্থার প্রধানকে ইসরায়েলি ফুটবল সংস্থার প্রধানের সঙ্গে করমর্দন করতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন।
ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে ফিফা এখন রাজনীতির হাতিয়ার। ২০১৮ সালে তিনি কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ওয়াশিংটনে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল আরব বিশ্বের আলোচনায় ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ সরিয়ে দেওয়া। ২০২১ সালে তিনি জেরুজালেমের মামিল্লাহ অঞ্চলের এক মুসলিম কবরস্থানের ওপর নির্মিত স্থানে জেরুজালেম পোস্ট আয়োজিত এক সম্মেলনে অংশ নেন। এছাড়া এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, যার লক্ষ্য জাতিসংঘকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলি দখলদারি ও গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি প্রয়াস বন্ধ করা। সেখানে তিনি ফুটবলের মাধ্যমে শান্তি ও পুনর্গঠনের নামে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা দেন।
বিশ্বকাপ ঘিরে চলা বিতর্কগুলো এই প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। ফিফা তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে এবং ফুটবলকে রাজনীতির বাইরে রাখার দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়িয়েছে। আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলার, রেফারি এবং দর্শকদের বিরুদ্ধে নানা নিয়মভঙ্গ করলেও ইনফান্তিনোর প্রতিক্রিয়া ছিল—সবাইকে ‘শান্ত থাকতে’ হবে।
এই সব ঘটনা আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে ফিফার ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বজনীনতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইনফান্তিনো যদি তাঁর পথ আমূল পরিবর্তন না করেন, তবে তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ধ্বংসের এক ইতিহাস হিসেবেই বিবেচিত হবে।
তবে ফিলিস্তিনি ফুটবল হার মানবে না। ১৯০৪ সালে জেরুজালেমে সেন্ট জর্জ স্কুল দলের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে। ফিলিস্তিনের জীবনের প্রতিটি স্তরে ফুটবল জড়িয়ে রয়েছে। আর ফিলিস্তিনের মতোই এই খেলাও দখলদারি, গণহত্যা এবং একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ফিফার বিরুদ্ধেও টিকে থাকার শক্তি রাখে।
— জাভিয়ের আবু ঈদ, ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের পিএইচডি গবেষক ও ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা। (আল–জাজিরা থেকে সংগৃহীত; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ)