উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত তীব্র হওয়ার খবর এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করার বিষয়ে ইরানের দাবির মুখে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চাপের মুখে পড়েছে শেয়ারবাজার। সোমবার সকালে এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারসূচক নিম্নমুখী থাকার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

ভূরাজনৈতিক এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে মুদ্রা ও বন্ডবাজারেও। নিরাপদ সম্পদের খোঁজে বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকে ঝুঁকায় ডলারের দাম বেড়েছে এবং মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাজারে ধারণা করা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ পুনরায় সুদহার বাড়াতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসে ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের প্রথম বক্তব্যের দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ববাজার।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হবে। জ্বালানির দাম গত কয়েক সপ্তাহে কিছুটা কমায় মূল্যস্ফীতি সামান্য কমতে পারে বলে ধারণা করা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে তেলের দাম পুনরায় বাড়ায় সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

সোমবার সকালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছেছে, যা কয়েক দিন আগে ছিল ৭০ দশমিক ১৪ ডলার। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৭ ডলারে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগের মাঝে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২০টি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করানো হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটগুলোর তথ্যমতে, এই পথে চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

বিনিয়োগকারীদের নজর এখন করপোরেট পরিসংখ্যানের দিকে। মঙ্গলবার থেকে বড় মার্কিন ব্যাংকগুলোর চলতি প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে। এরপর নেটফ্লিক্স ও জেনারেল ইলেকট্রিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আয়ের তথ্য জানাবে। আশা করা হচ্ছে, কোম্পানিগুলোর ভালো মুনাফার খবরে বাজারের উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংক সিটির বিশ্লেষকেরা প্রযুক্তি খাত নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) শেয়ারে অস্থিরতা থাকলেও এই খাতে মুনাফা ও মূল্যায়ন ভালো থাকায় দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অক্ষুণ্ন আছে।

তবে দিনের শুরুতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক ফিউচার নিম্নমুখী ছিল। ইউরোপের প্রধান সূচকগুলোর ফিউচারও নিম্নমুখী এবং জাপানের নিক্কেই সূচক টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বড় পতনের মুখে পড়েছে। এছাড়া এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই সূচকও নেমে গেছে।

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় নেমেছিল। তবে সোমবারের মূল্যবৃদ্ধির পর তেলের দাম ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে প্রথম দফা হামলার আগের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেলবিশ্লেষক মুকেশ সহদেব মনে করেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ওপরে থাকবে। গত শনিবার গ্রাহকদের উদ্দেশে দেওয়া এক নোটে সহদেব বলেন, "এ সময়ের মধ্যে তেলের দামে মাঝেমধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যেতে পারে, তবে তা এই সীমার মধ্যেই থাকবে।"

তিনি আরও বলেন, "দূরপাল্লার জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে শোধনাগারগুলোকে কয়েক সপ্তাহ আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সে কারণে তারা ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাৎক্ষণিক নির্ভরতা কিছুটা হ্রাস করেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় সেই প্রবণতা আরও জোরালো হবে।"

অন্যদিকে, সিডনিভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইজির বাজার-বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপ মনে করেন, তেলের দাম পুনরায় ১০০ ডলার ছাড়ানোর সম্ভাবনা কম। আজ প্রকাশিত এক নোটে তিনি বলেন, "জুন মাসে তেলের দাম যে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে গেল, তার পেছনে বাজারের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা যতই নাজুক হোক, তা টিকে থাকবে। তবে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় প্রমাণিত হয়েছে, সে ধারণার ভিত্তি কতটা ভঙ্গুর ছিল।"

তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০২৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে, যার ফলে ডলার আরও শক্তিশালী হয়েছে। বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় সোনার আকর্ষণ কমেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১ শতাংশের বেশি কমে ৪ হাজার ৭৬ ডলারে নেমে এসেছে।