সমতলের আদিবাসীদের উন্নয়নে একটি পৃথক সরকারি সংস্থা গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ‘নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির কথা এসেছে—যা সংশ্লিষ্ট দাবির প্রতি ইতিবাচক সাড়া হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে অধিদপ্তরের প্রকৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং কার্যপরিধি সম্পর্কে এখনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। ফলে উদ্যোগটিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আদিবাসী মহলে, বিশেষ করে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—সবই নির্মিত হয়েছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন আজও আদিবাসী জনগণসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীদের জীবনে দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বুদ্ধিজীবী ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে প্রভাবশালী সংকীর্ণ ‘জাতীয়তাবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি—এবং সংবিধান, আইন, জননীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব—এই ব্যবধানের বড় কারণ হিসেবে বারবার উঠে আসে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। সব জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘রংধনুর বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও ছিল তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে। কিন্তু আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনা কীভাবে দূর করা হবে—সে বিষয়ে ইশতেহারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত। পূর্ববর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ পরিচয় বহাল রেখে ‘নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এবং কিছু সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচির উল্লেখ পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ের জনগণের উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে। তবু আদিবাসী অধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন মহল অভিযোগ করে আসছে যে, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহির অভাব এবং আদিবাসীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় বহু ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন ও অধিকার সুরক্ষার পরিবর্তে আদিবাসীদের রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রান্তিকীকরণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
আর্থসামাজিক উন্নয়নের সূচকগুলোর বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, তারা দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ কর্মসূচির অধীনে তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে সমতলের আদিবাসীদের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে একটি পৃথক আদিবাসী উন্নয়ন-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে সামনে আসে।
আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি যে সরকার ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’–এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তাবিত নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তরের আওতায় আনার কথা বিবেচনা করছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ভাষ্য থেকেও এমন ধারণার অবকাশ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় এবং সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে “নৃ-জাতিগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর” প্রতিষ্ঠা করা হবে।’
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, উন্নয়নের পাশাপাশি ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দায়িত্বও নতুন অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে অধিদপ্তরটি বিদ্যমান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিপূরক না হয়ে তাদের বিকল্প, এমনকি তদারককারী কাঠামোতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩টি, সমতলের বিভিন্ন জেলায় ৭টিসহ মোট ১০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১০ সালের আইনের ৫(৩) ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একটি স্বতন্ত্র আইনগত সত্তাসম্পন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা; যার নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং বিধি-প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই স্বাতন্ত্র্যই আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পূর্বশর্ত। কারণ দেশের ৫০টির বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। কেন্দ্রনির্ভর একক প্রশাসনিক কাঠামোর পক্ষে এ বৈচিত্র্যের যথাযথ প্রতিফলন ঘটানো বাস্তবসম্মত নয়।
বিদ্যমান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি একটি একক প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা হয়, তাহলে সেগুলো স্বায়ত্তশাসন, সৃজনশীলতা, নমনীয়তা ও কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। শেষ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান কোনো মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নকারী সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের উন্নয়নের জন্য, বিশেষ করে সমতলের আদিবাসীদের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা জরুরি। তবে এটি কেবল একটি সরকারি অধিদপ্তর হিসেবে থাকলে হবে না; সংসদে প্রণীত আইনের মাধ্যমে একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হওয়াই কাম্য।
এ ধরনের কাঠামো থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে আদিবাসীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। একই সঙ্গে এটি বিদ্যমান আদিবাসী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে পারবে—কিন্তু কোনো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে না দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকেবে।
রাষ্ট্র ও আদিবাসী জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক কেবল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বীকৃতি ও অর্থবহ অংশীদারত্বের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে। দূরদর্শী রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন—স্বতন্ত্র পরিচয়ের স্বীকৃতি, প্রথাগত প্রতিষ্ঠান ও চর্চার প্রতি সম্মান, ভূমির অধিকার সুরক্ষা, এবং প্রস্তাবিত নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায় ও ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
● রাজা দেবাশীষ রায় চাকমা সার্কেলের চিফ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
● ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরা গবেষক ও উন্নয়নকর্মী






