ঢাকায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালান সোহরাব সরদার। গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি রাজধানীর কাজীপাড়ায় হাঁটুপানিতে বিকল হওয়া মোটরসাইকেলটি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর গন্তব্য মগবাজার।

সোহরাব বলেন, মিরপুর ১০ নম্বরে যাত্রী নামিয়ে ফেরার পথে তাঁর মোটরসাইকেলে পানি ঢুকে বিকল হয়ে গেছে। এখন সেটিকে ঠেলে ঠেলে মগবাজার পর্যন্ত সারাতে হবে। এতে পুরো দিনে আর কোনো আয়ের আশা দেখছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘আজকে (গতকাল) আর কোনো ট্রিপ পামু না।’

ঢাকায় শনিবার দিবাগত রাত ও গতকাল দিনের প্রথম ভাগে যে বৃষ্টি হয়েছে, তাতে জলাবদ্ধতা ও মানুষের দুর্ভোগের চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পানি জমে যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে। ঘর থেকে বের হওয়া মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির পাশাপাশি বহু বাড়িতেও পানি ঢোকে। এমন পরিস্থিতিতে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে পরীক্ষা স্থগিত ও ক্লাস বাতিল করে ছুটি দিতে বাধ্য হয়।

বৃষ্টির পর নগরবাসীকে আশ্বস্ত করতে অতীতে বলা হয়েছিল—‘১৫ মিনিটের মধ্যে’ পানি নেমে যাবে এবং ‘জলাবদ্ধতা দেখা যাবে না’। এই আশ্বাস দিয়েছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন (২০১৭ সালে) এবং ঢাকা দক্ষিণের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস (২০২৩ সালে)। সেই সঙ্গে খরচও করা হয়েছিল বহু টাকা।

বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই ‘আউটলেট’ সচল করা হচ্ছে না।
আদিল মুহাম্মদ খান, অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যান্য কাজে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে যায়নি।

২০২৫ সালে কত খরচ হয়েছে, সে হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ২০২৫ সালের এপ্রিলে বলেছিলেন, চিহ্নিত ১৯টি স্থানের মধ্যে ৭টিতে জলাবদ্ধতা হতে পারে এবং পানি তিন ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ‘রাইট পারসন, রাইট টাইমে, রাইট জায়গায়’ থাকার কারণে বড় জলাবদ্ধতা হয়নি বলে দাবি করেন।

গতকালের বৃষ্টিতে যে পরিস্থিতি দেখা গেছে, তা ওই দাবিগুলোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নগর–পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকায় এত বেশি বৃষ্টির কারণেই জলজট হতে পারে। তবে তাঁদের মতে, জলাবদ্ধতা হলে সেটাকে ব্যর্থতা হিসেবেই দেখতে হবে।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা সাধারণত অল্প সময় পানি জমে থাকাকে ‘সাময়িক জলজট’ বলে উল্লেখ করেন। নগর-পরিকল্পনার সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে নালার তাৎক্ষণিক ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যে পানি জমে এবং বৃষ্টি কমার পর দ্রুত নেমে যায়—সেটিই জলজট। আর নালা, খাল, কালভার্ট বা আউটলেট বন্ধ, সরু কিংবা বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকা এবং একই এলাকায় বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই জলাবদ্ধতা।

গতকালের বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় পানি দ্রুত নেমেছে, আবার অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তা আটকে ছিল। ফলে নগরবাসীর ভোগান্তির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে জলাবদ্ধতা। নগর–পরিকল্পনাবিদদের মতে, সমস্যার কারণ দুটি—পানি নেমে যাওয়ার যথেষ্ট পথ না থাকা এবং খালগুলোর অনেকাংশ বেদখল, ভরাট ও আবর্জনায় ভরা। যে ড্রেন বা নালা দিয়ে পানি নামার কথা, সেগুলিও বালু ও আবর্জনায় ভরে গেছে।

ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান গতকাল কাজীপাড়ার পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। তাঁর ভাষ্য, যত্রতত্র ময়লা ফেলায় নালার সংযোগ বন্ধ হয়ে অধিকাংশ জলজট তৈরি হচ্ছে। এর আগে তিনি বিমানবন্দর সড়ক, মিরপুরসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নালা ও খালের পানিপ্রবাহ শতভাগ সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রোববারের পরিস্থিতি দেখিয়েছে, সেই প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হয়েছে আরও ৮২ মিলিমিটার; অর্থাৎ ১২ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১৫৮ মিলিমিটার।

এর আগের উদাহরণ হিসেবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ ঘণ্টায় ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টির পর রাজধানীর কিছু সড়ক থেকে ১৫ ঘণ্টাতেও পানি নামেনি। এর আগে এক দিনে ঢাকায় ২৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিও হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৩ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা ডুবে যায়। মতিঝিল, কমলাপুর, গ্রিন রোড ও ঢাকা কলেজ এলাকার পানি ১২ ঘণ্টায়ও সরেনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকার মধ্যে রয়েছে গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, বনানী-কাকলী, বারিধারা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, নিউমার্কেট, আজিমপুর, মতিঝিল, শ্যামপুর ও কদমতলী।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও ঢাকা কলেজের সামনের সড়কে পানি এতটাই বেড়েছিল যে সড়ক ও ফুটপাতের সীমানা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সকাল থেকে নিউমার্কেটের সব দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। কোনো ক্রেতাও সেখানে যেতে পারেননি।

নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিস সেক্রেটারি ফিরোজ উল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পরিস্থিতি দেখে আজ সোমবার দোকান খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নিউমার্কেট এলাকার জলাবদ্ধতা সমাধানের গাফিলতির একটি উদাহরণ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিউমার্কেটের জলাবদ্ধতা নতুন নয়। আগে নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকার পানি পিলখানার একটি নালা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় যেত। ২০০৯ সালের পর নিরাপত্তার কারণে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন কোনো কার্যকর পথ তৈরি করা হয়নি। ফলে বৃষ্টি বেশি হলেই ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটিতে ২৯টি খাল রয়েছে। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৫ কিলোমিটার। খোলা ও পাইপ-নালা মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ২৬টি খাল এবং ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি নালা-নর্দমা।

নথিপত্রে এত খাল-নালা থাকলেও পানি নামার পুরো পথ সচল নয়। বৃষ্টির পানি প্রথমে সড়ক থেকে নালায়, পরে কালভার্ট ও খাল হয়ে ‘আউটলেট’ দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। এই পথে কোনো একটি অংশ বন্ধ, সরু বা বিচ্ছিন্ন হলে পুরো ব্যবস্থার সক্ষমতা কমে যায়।

উত্তর সিটির প্রকৌশল বিভাগ বলছে, ২৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পানি নেমে যায়। এর বেশি হলে সময় লাগে। গতকাল সংস্থাটি পানি সরানোর কাজে বাড়তি জনবল নিয়োগ করেছিল। একইভাবে দক্ষিণ সিটিও চেষ্টা করেছে বলে দাবি করেছে।

দক্ষিণ সিটির পানি মূলত তিনটি আউটলেট দিয়ে নদীতে যাওয়ার কথা। দোলাইপাড় পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের প্রতিটি প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ হাজার লিটার পানি সরাতে পারে। কমলাপুরের টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটি সচল।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোথাও নালার মুখ বর্জ্য ও পলিতে বন্ধ, কোথাও কালভার্ট সরু, আবার কোথাও খালের সঙ্গে নালার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পানি পাম্প পর্যন্ত না পৌঁছালে উচ্চক্ষমতার পাম্পও কাজ করে না।

দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান গতকাল বিকেলে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি তাৎক্ষণিকভাবে এবং ৩০ থেকে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টায় সরানো সম্ভব। গতকালের বৃষ্টি সেই সক্ষমতার কয়েক গুণ।

তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—বেশি বৃষ্টি ঢাকায় বিরল ঘটনা নয়। এত টাকা খরচের পরও সেই প্রস্তুতি নেই কেন?

জলাবদ্ধতা নিরসনে ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাবটি দুই সময়ের। ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০—এই পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ এবং উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করে। একই সময়ের কাছাকাছি ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। সব মিলিয়ে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। দুই সময়ের অঙ্ক যোগ করলে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার বেশি।

প্রশ্ন উঠছে—নালা নির্মাণ করা হলেও পানি যাওয়ার শেষ পথটি সচল হয়েছে কি না। অনেক ক্ষেত্রে তা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে এত ব্যয়ের পরও দুই সিটি গত এপ্রিলে ঢাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১০৮টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ৩৩টি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সময়ে মন্ত্রী ও মেয়ররা যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না। মুখরোচক বক্তব্য না দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে হলে পানিনিষ্কাশনের পথ বাড়াতে হবে।

নগর-পরিকল্পনাবিদদের অবস্থানও একই ধারার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঢাকায় প্রাকৃতিক জলপথ ও কৃত্রিম নালাকে যুক্ত করে সমন্বিত পানিনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেই ‘আউটলেট’ সচল করা হচ্ছে না। শুধু যেখানে পানি জমে, সেখানে নতুন নালা বানিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তাঁর ভাষায়, প্রশ্ন হলো নতুন সরকার কি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করে কাজ করবে, নাকি বিগত সময়ের মতো অপরিকল্পিতভাবে টাকা ঢালবে। পরিকল্পিতভাবে কাজ না করা হলে মানুষের ভোগান্তি যাবে না।

এদিকে গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকার অনেক জায়গায় পানি জমে ছিল। ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালক সোহরাব সরদার রাতে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তিনি গতকাল ৩০০ টাকা আয় করেছিলেন। মোটরসাইকেল ঠেলে ঠেলে মগবাজার নিয়ে মেরামত করাতে সেই ৩০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আর পথে নামতে পারেননি তিনি।