নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় বাক্প্রতিবন্ধী ওয়াহিদা বেগম ওরফে ববি বেগমের (৭০) পরিবারের আরও সদস্য বগুড়া থেকে এসে তাঁর কবর দেখতে এসেছেন। আজ রোববার বিকেলে স্টেশন–সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে ওই নারীর কবর জিয়ারতের সময় আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দারা নিহত ওই নারীকে ববি বেগম হিসেবে চিনলেও তাঁর আসল নাম ওয়াহিদা বেগম। ৪ জুলাই দিবাগত রাত দুইটার দিকে রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাঁকে মারধর করে দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে একদল দুর্বৃত্ত। হামলার পর ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
.রেলস্টেশনে হামলায় নিহত ববি বেগমের পরিচয় জানা গেছে, বাড়ি বগুড়ায়.কোনো স্বজন না থাকায় প্রথমে ওই নারীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশন–সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
ওই নারীর মৃত্যুর খবর ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে গতকাল শনিবার দুপুরে তাঁর কবর জিয়ারত করতে আসেন দুই স্বজন। তাঁরা জানান, ববি বেগমের প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগম। বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামে। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। তাঁর আট ভাইবোনের মধ্যে সাতজনই বাক্প্রতিবন্ধী। এর মধ্যে ওয়াহিদাসহ তিনজন মারা গেছেন।
আজ পরিবারের আরও ১৩ জন সদস্য বগুড়া থেকে মাইক্রোবাসে করে বেলা সাড়ে তিনটায় মেথিকান্দা স্টেশনে এসে পৌঁছান। এরপর ওয়াহিদার কবর জিয়ারত করেন তাঁরা। এ সময় তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনদের মধ্যে ওয়াহিদার তিন বাক্প্রতিবন্ধী ভাইবোন উপস্থিত ছিলেন।
.নরসিংদীতে বাক্প্রতিবন্ধী ববি বেগম হত্যার বিচার চেয়ে ঢাবিতে মানববন্ধন.এত দিন ওয়াহিদার খোঁজ করেননি কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াহিদার ভাগনির স্বামী পরিচয় দিয়ে সৈকত ইসলাম নামের একজন জানান, ২৫ বছর আগে যখন ওয়াহিদা বেগম বাড়ি ছাড়েন, সে সময়ের পরিস্থিতি বুঝতে হবে। তাঁর আট ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় এক ভাই বাদে সবাই বাক্প্রতিবন্ধী। ওই ভাই আশপাশের সব জেলায় ওয়াহিদার খোঁজ করা হয়। তিনবছর খোঁজাখুঁজির পর সন্ধান না পেয়ে হাল ছেড়ে দেন স্বজনেরা। পরে বড় ভাই মারা গেলে আর খোঁজ নেওয়ারও কেউ ছিলেন না। তাঁদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে ২০ জনই বাক্প্রতিবন্ধী। সৈকত ইসলাম বলেন, ‘২৫ বছর পর তাঁর (ওয়াহিদার) কবরটা হলেও আমরা দেখতে পেরেছি, এটাই শান্তির। মেথিকান্দা স্টেশন ও আশপাশের মানুষের কাছে আমরা খুবই ঋণী, তাঁরা ওয়াহিদা বেগমকে আগলে রেখেছিলেন।’
মেথিকান্দা রেলওয়ে পুলিশ স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই যুগ আগে এক দুপুরে এই স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী ওয়াহিদা। এরপর আর কোথাও যাননি, স্টেশনটির পরিত্যক্ত একটি কক্ষ ছিল তাঁর আশ্রয়। বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া, শৌচাগার পরিষ্কারসহ তিনি বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন। স্টেশন ও আশপাশের মানুষসহ অনেকে তাঁকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫-১০ টাকা সহযোগিতা করতেন। ওই টাকা খরচ না করে দুই যুগ ধরে জমিয়েছিলেন। সেই টাকাই ছিনিয়ে দিতে কাল হলো তাঁর।
.রেলওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ ওয়াহিদা বেগম নিহত হওয়ার ঘটনায় ৬ জুলাই রাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ভৈরব রেলওয়ে থানায় মামলা হয়। মামলাটি হামলা ও লুটের অভিযোগে করা হলেও ওয়াহিদা বেগম মারা যাওয়ার পর হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়। সেই মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচজনকে আজ আদালতে তোলা হলে তাঁদের তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন বিচারক।






