বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কি কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে, নাকি স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে—বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একদিকে সরকার আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে গবেষণা অনুদান সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশ মনে করছে, এতে গবেষণা আরও আমলাতান্ত্রিক হবে এবং একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত হবে।
মূলত এই বিতর্কের কেন্দ্রে অর্থের চেয়ে আস্থার প্রশ্নটি বেশি প্রকট। রাষ্ট্র কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা পরিচালনার মতো সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বাস করে, নাকি তাদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় কেবল শ্রেণিকক্ষ বা ক্যাম্পাসে নয়, বরং গবেষণার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নীতিনির্ধারণে অবদান এবং সামাজিক সমস্যার সমাধান—সবই সম্ভব বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণায়। এই কারণেই বৈশ্বিক মূল্যায়নে গবেষণার মান, প্রকাশনা, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বাস্তব প্রভাবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও গবেষণার চিত্র ইতিবাচকভাবে বদলাচ্ছে। স্কোপাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশি গবেষকেরা ১৫ হাজার ৪১৩টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। একই বছরে ওয়েব অব সায়েন্স কোর কালেকশনে সূচিভুক্ত হয়েছে ১৩ হাজার ২৮০টি গবেষণা। প্রকাশনার সংখ্যার পাশাপাশি সাইটেশন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো দেশের বৃহত্তম গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া বুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করছে। সীমিত বাজেট, আধুনিক ল্যাবরেটরির অভাব এবং পাঠদানের অতিরিক্ত চাপের মধ্যেও গবেষকেরা এই সাফল্য অর্জন করেছেন। এমতাবস্থায় গবেষণা পরিচালনার কাঠামোকে আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অবশ্যই গবেষণা অনুদানের অপব্যবহার, মানহীন গবেষণা বা আর্থিক অনিয়মের মতো উদ্বেগগুলো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জনগণের অর্থের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তবে জবাবদিহিতা মানেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়। যুক্তরাজ্যে ইউকে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন (ইউকেআরআই), অস্ট্রেলিয়ার অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল (এআরসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন (এনএসএফ) অনুদান প্রদান ও মূল্যায়ন করলেও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে গবেষণা পরিচালনা করে না। অর্থদাতা সংস্থা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এবং বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা পরিচালনা করে—এই ভারসাম্যই আন্তর্জাতিক সফলতার ভিত্তি।
ইউজিসির ভূমিকাও হওয়া উচিত মান নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অডিট পরিচালনা করা। কিন্তু প্রতিটি প্রশাসনিক ধাপ নিজেদের হাতে নিলে দীর্ঘমেয়াদে তা কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। গবেষণা সময়ের সাথে এক প্রতিযোগিতা। যন্ত্রপাতি ক্রয়, আন্তর্জাতিক চুক্তি বা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের মতো জরুরি সিদ্ধান্তে বিলম্ব হলে গবেষণার অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। অতিরিক্ত প্রশাসনিক স্তর সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত শিক্ষাবিদদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি করেছে। যেমন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ চালু না করার উদ্যোগ (বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয় না পড়ানোর উদ্যোগ, ২১ মার্চ ২০২৫, দৈনিক মুক্তকণ্ঠ)। সমালোচকদের মতে, এসব সিদ্ধান্তে পর্যাপ্ত গবেষণা ও অংশীজনের মতামতের ঘাটতি ছিল। গবেষণা অনুদানব্যবস্থার পরিবর্তনটিও কি একই ধরনের প্রশাসনিক সুবিধার বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত?
ইউজিসি পরিচালিত প্রায় চার হাজার কোটি টাকার হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্প নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, গত বছরের গবেষণা প্রস্তাবনা মূল্যায়ন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে, যা জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এসব গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে স্বাধীন তদন্তের অভাব উদ্বেগজনক।
ইউজিসির নিজস্ব গবেষণা প্রকল্পগুলোর প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কথা উল্লেখ করে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন যে, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা কতটা বাস্তবসম্মত। কারণ, অনেক সময় দুই বছরের প্রকল্প শেষ হতে তিন থেকে চার বছর লেগে যায়।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মূল সমস্যা অনিয়মের চেয়ে বিনিয়োগের ঘাটতি বেশি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেটের বড় অংশ বেতন-ভাতা ও অবকাঠামোয় ব্যয় হয়। ইউজিসি জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গবেষণার জন্য ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে বরাদ্দের পাশাপাশি তা দ্রুত ও গবেষকবান্ধব উপায়ে ব্যবহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিতর্কটি বরাদ্দ নিয়ে নয়, বরং গবেষণা শাসনব্যবস্থা নিয়ে। স্বায়ত্তশাসন মানে জবাবদিহিতার অভাব নয়, আবার জবাবদিহিতা মানেই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নয়। আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউ, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, ডিজিটাল আর্থিক ট্র্যাকিং এবং নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দেওয়া সম্ভব।
রাষ্ট্রের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়কে সক্ষমতার চোখে দেখা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে স্বাধীন গবেষণার ওপর। প্রশাসনিক ফাইলের মতো গবেষণাকে পরিচালনা করলে উদ্ভাবন সম্ভব নয়। উদ্ভাবন জন্মায় স্বাধীন চিন্তা ও একাডেমিক আস্থার পরিবেশে।
আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই যারা প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য অনুমতির অপেক্ষায় থাকবে, নাকি যারা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক গবেষণায় নেতৃত্ব দেবে? বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, দ্বিতীয় পথটিই সফলতার পথ।
বাংলাদেশেরও সেই পথেই হাঁটা উচিত। কারণ, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো প্রশাসনিক নির্দেশে গড়ে ওঠে না। গড়ে ওঠে গবেষণার স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কঠোর জবাবদিহির সমন্বয়ে। গবেষণার অর্থ কোথায় থাকবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো গবেষণার স্বাধীনতা কার হাতে থাকবে।
— ড. মো. সাহাবুল হক
অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
(মতামত লেখকের নিজস্ব)






