ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখার কোনো বিকল্প নেই। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বলতে আমরা এখনো কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নকেই প্রাধান্য দিই। এর বিপরীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষক-ঘাটতির কারণে বিদ্যালয়গুলোতে জোড়াতালির পাঠদান এখন নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষা নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা।

মুক্তকণ্ঠের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫৫ শতাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই এবং ১৮ শতাংশের বেশি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য। বর্তমানে দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২টি, যার মধ্যে ৩৮৩টি বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই। এছাড়া সহকারী প্রধান শিক্ষকের ২৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি হলেও ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য। এর ফলে বিদ্যালয়গুলো একদিকে যেমন নেতৃত্বের সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার্থীদের শিখন-ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনের জনবল সংকটেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালকের ১০টি পদই বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ৬৪টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে ২৩টি শূন্য এবং বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের সবকটিই খালি। প্রশাসনিক কাঠামোর এমন শূন্যতার মাঝে মাধ্যমিক শিক্ষার তদারকি ও পরিচালনা কীভাবে সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বিদ্যমান অবহেলা ও দীনতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ওপর। শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের শিখন-ঘাটতি নিয়ে উচ্চতর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে এবং আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ঝরে পড়ার হার। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করার পরও তারা কর্মক্ষেত্রের জন্য যোগ্য মানবসম্পদ হয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে।

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে সুপারিশ করা হয়েছিল যে, প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকতে হবে। তবে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গড়ে প্রতি ৩৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। ঢাকা ও নেত্রকোনার দুটি বিদ্যালয়ের উদাহরণে দেখা যায়, পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন।

মাধ্যমিক শিক্ষা মূলত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষক না থাকলে পাঠদান ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে নির্ধারিত ক্লাসের বাইরে দিনে ছয়-সাতটি ক্লাস নিতে হচ্ছে, যা কার্যকর পাঠদানের ক্ষেত্রে ঘাটতি তৈরি করছে। এতে শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জন দুর্বল হচ্ছে এবং শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সাধারণত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার মান ও সুযোগ-সুবিধা বেশি বলে গণ্য করা হয়। সেখানে শিক্ষক-ঘাটতিতে পাঠদান বাধাগ্রস্ত হলে অন্যান্য বিদ্যালয়ের অবস্থা আরও শোচনীয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারকে দ্রুত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে হবে।