নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ও হইচই-এর মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রাইবার হয়ে শুরুতে মনে হয়েছিল, দর্শক হিসেবে কনটেন্ট বাছাইয়ের সুযোগও আমাদের হাতে চলে এসেছে—এবং তুলনামূলকভাবে উঁচু মানের কনটেন্টও দেখা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের কনটেন্টের জন্য এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম কবে পাওয়া যাবে—এই আক্ষেপ ছিল দীর্ঘদিনের। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে চরকির সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার পর সেই দুঃখ অনেকটাই ঘুচে যায়। চরকির পাঁচ বছরের যাত্রার পুরো সময়টিই আগ্রহ নিয়ে দেখা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যে কনটেন্ট পাওয়া গেছে, তা মূল্যবান। সামনের দিনগুলোতেও আরও বহু অমূল্য কনটেন্ট আসবে—এ বিষয়ে সন্দেহ কম।
দর্শক হিসেবে চরকির কনটেন্ট-বৈচিত্র্যও আলাদা করে ভালো লাগে। পাঁচ বছর ধরে প্রতি মাসে চরকি গড়ে দুটি করে অরিজিনাল কনটেন্ট এনেছে। এর মধ্যে ড্রামা সিরিজ, শর্টফিল্ম, টেলিফিল্ম, ফিল্ম ও ডকুমেন্টারি—বিভিন্ন ধরনই রয়েছে। রোমান্স, রাজনীতি, অপরাধ, সায়েন্স ফিকশন, ভৌতিক-আধিভৌতিক—যে বিষয়েই তারা বিচরণ করতে দ্বিধা করেনি।
কনটেন্ট বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিও সন্তোষজনক। সব কনটেন্ট সমানভাবে ভালো নাও হতে পারে, তবে যে ন্যূনতম মানটি বজায় রাখার চর্চা করা হয়, তাতেই চরকির যে কোনো কনটেন্ট দেখে শেষ করা যায়। এই ধারাবাহিকতায় চরকির কাছ থেকে বেশ কিছু অসাধারণ কনটেন্টও পাওয়া গেছে।
চরকির সবচেয়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট হিসেবে থ্রিলার সিরিজ ও সিনেমাকেই আলাদা করে উল্লেখ করা যায়। এগুলোর টান টান গঠন—উপভোগ্য থ্রিলার হিসেবে—অশ্লীলতা বা গালাগালির ভর ছাড়াই কাহিনি, অভিনয় এবং পরিচালনার গুণে জমে উঠেছে। থ্রিলারগুলোর মধ্যে ‘মরীচিকা’, ‘ঊনলৌকিক’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘৭ নাম্বার ফ্লোর’, ‘রেডরাম’, ‘শাটিকাপ’, ‘কালপুরুষ’, ‘সিনপাট’, ‘গুটি’, ‘ক্যাকটাস’, ‘দাগি’, ‘তুফান’, ‘তাণ্ডব’ ও ‘দম’ দর্শকের মধ্যে সত্যিকারের রোমাঞ্চের অনুভূতি দিয়েছে। ‘সিন্ডিকেট’ সিরিজের স্পিন-অফ হিসেবে ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’ ও ‘অ্যালেন স্বপন ২’ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘সিন্ডিকেট’ সিরিজের সিক্যুয়েল হলেও এগুলোর ধারাবাহিকতা আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করা গেলে আরও আকর্ষণীয় হতো—এমন মতও আছে।
রোমান্স ক্ষেত্রেও চরকির কাজ নজর কাড়ে। টেলিভিশন-রোমান্সের পরিচিত কিছু গৎবাঁধা ধারাকে ভেঙে, সময়ের তরুণ-তরুণীদের রোমান্সকে সামনে আনার চেষ্টা দেখা যায়। অন্তত ‘নেটওয়ার্কের বাইরে;, ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া;, ‘ফরগেট মি নট’, ‘৩৬-২৪-৩৬’ ও ‘লিটল মিস ক্যাওস’ দেখে এমনটাই মনে হয়।
সাহস করে কিছু কমেডি, ডার্ক কমেডি ও হরর কনটেন্টও উপহার দিয়েছে চরকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। এই জনরায় উৎসব সবচেয়ে সফল বলেই মনে হচ্ছে। তবে ‘ইউটিউমার’, ‘কাফে ডিজায়ার’, ‘হ্যাপি বার্থডে’ এবং ‘২ষ’—এই চার সিরিজও অনেকদিন মনে থাকার মতো। অ্যান্থোলজি সিরিজের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘জাগো বাহে’ নিঃসন্দেহে সেরা এবং এ মুহূর্তে এই দশকের বাংলাদেশকে ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
সব মিলিয়ে লেখকের হিসাবে চরকির সেরা কনটেন্ট—সেগুলোই, যেগুলো বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাকে শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরে। নারীবিদ্বেষ, বৈষম্য, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করলেও চরকি গল্প বা শিল্পমানের সঙ্গে আপস করেনি। বরং শক্তিশালী গল্প, নির্মাণ ও অভিনয়ের মাধ্যমে এসব বাস্তবতাই দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে। ‘চা গরম’, ‘রেহানা মরিয়ম নূর’, ‘স্কুটি’, ‘তনয়া’, ‘দুই দিনের দুনিয়া, ‘প্রিয় মালতী, ‘আমলনামা, ‘জয়া আর শারমিন ও সদ্য আসা ‘লাইফলাইন’—এ ধরনের কনটেন্টকেই উল্লেখ করা হয়েছে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে।
ভালো কনটেন্টের এই দীর্ঘ তালিকা দেখেও বোঝা যায়, বাংলাদেশি মানসম্মত কনটেন্টের বৈশ্বিক শোকেস হয়ে উঠেছে চরকি। গিয়াসউদ্দিন সেলিম, রায়হান রাফী, ভিকি জাহেদ, আদনান আল রাজীব, অনম বিশ্বাস, পিপলু আর খান, শিহাব শাহীনের মতো প্রতিষ্ঠিত পরিচালকদের জন্য আরও বড় ক্যানভাসে কাজের সুযোগ তৈরি করেছে প্ল্যাটফর্মটি। একই সঙ্গে চরকি মিজানুর রহমান আরিয়ান, নুহাশ হুমায়ূন, রবিউল আলম রবি, শঙ্খ দাশগুপ্ত, সৈয়দ আহমেদ শাওকী, মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের মতো পরিচালকদের কাজও দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এই পরিচালকদের হাত ধরেই উঠে এসেছে একঝাঁক ভালো এবং প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা-অভিনেত্রী।
বাংলাদেশ সরকার ইদানীং ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ এবং তার সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে—এটি আশাব্যঞ্জক। তবে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে সক্রিয়’ করতে সরকারের জন্য চরকির মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে ভালো একটি সূচনাবিন্দু হিসেবে দেখা যায়। রাজশাহীর তরুণ নাট্যজন নাটক ও সিনেমা তৈরির প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি অবকাঠামো তৈরি করতে শুরু করেছেন—চরকির প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে—এ তথ্য জানার পরও আনন্দ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রণোদনা পেলে এমন আঞ্চলিক অবকাঠামো চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, বরিশালেও হতে পারে বলে আশা করা হয়েছে।
চরকিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল করতে নানা প্রতিবন্ধকতা পার হতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্বমানের বাংলা কনটেন্ট তৈরি এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশে আনার প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত বাধাও মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার চরকিকে নীতিগত ও কূটনৈতিক সহায়তা দিলে তা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির বিস্তারে সহায়ক হতে পারে—এমন প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়েছে।
চরকির ব্যবসায়িক সাফল্য করপোরেট বিনিয়োগের ওপরও নির্ভর করবে। দেশের বিভিন্ন বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে চরকির সঙ্গে কিছু কনটেন্ট সহপ্রযোজনা করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকা এবং উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার কথাও বলা হয়েছে। ভালো বিনিয়োগ না হলে বিশ্বমানের কনটেন্ট তৈরি হবে না এবং বাংলাদেশের কনটেন্ট বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে পারবে না—এই যুক্তিও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব দর্শকদের ওপর—এ কথাও জোর দিয়ে বলা হয়েছে। দেশের সমর্থ দর্শক যদি বেশি হারে চরকি সাবস্ক্রাইব করেন, তবেই চরকির পক্ষে আরও বেশি এবং আরও ভালো মানের কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব হবে। বিনা মূল্যে যে ভালো কনটেন্ট উপভোগ করা যাবে না—সেটি দর্শক হিসেবে অনেকদিনেই উপলব্ধি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবশেষে, দর্শক হিসেবে চরকিকে পাঁচ বছর পূর্তির শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। স্ট্যান্ডআপ কমেডি নিয়ে চরকির আরও কাজ করার প্রয়োজন আছে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের মণিমুক্তাকে কনটেন্টে পরিণত করার কাজ আরও নিষ্ঠার সঙ্গে করাও চরকির পক্ষেই সম্ভব বলে মনে করেন লেখক। ফিল্ম, ফান, ফুর্তির এই যাত্রা আমাদের জন্য আরও উপভোগ্য ও হৃদয়গ্রাহী হবে—এই আশা নিয়ে চরকির দিকেই তাকিয়ে থাকার কথাই বলা হয়েছে।
খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার: লেখক, গবেষক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কিমেকারস কনসাল্টিং লিমিটেড





