দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে বিজ্ঞানশিক্ষা, মহাকাশবিষয়ক জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষামূলক পর্যটনের প্রসার ঘটাতে নভোথিয়েটার নির্মাণের উদ্যোগটি ছিল নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আঞ্চলিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমুখী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। তবে শত শত কোটি টাকার এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পথে যে অদূরদর্শিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বরিশাল ও রংপুরে প্রকল্পের ব্যয় এবং সময়সীমা কয়েক দফা বাড়ানো হলেও কাজ এখনো ঝুলে আছে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থান নির্ধারণ ও জমিসংক্রান্ত টানাপোড়েনের পর খুলনার নভোথিয়েটার প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। বরিশাল ও রংপুরে ভবনের কাঠামো তৈরি হলেও ডোম, টেলিস্কোপ, ডিজিটাল প্রজেকশন ও ইলেকট্রোমেকানিক্যাল সরঞ্জামের মতো মূল প্রযুক্তিগত অংশগুলোর স্থাপন এখনো বাকি। এই অত্যাধুনিক যন্ত্রগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, ডলার-সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে এই জটিল কাজগুলো সম্পন্ন করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। উল্লেখ্য, বরিশালে ৪১২ কোটি টাকার প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬০ কোটি এবং রংপুরে ৪১৮ কোটি টাকার প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ কোটিতে। অর্থাৎ, যথাসময়ে কাজ শেষ না হওয়ার মাশুল দিতে হচ্ছে জনগণের করের টাকায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে।

সবচেয়ে দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে খুলনায়। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে কেবল স্থান নির্ধারণ, জমি অধিগ্রহণ এবং স্থানীয় আপত্তির বেড়াজালে ঘুরপাক খেয়ে একনেকে অনুমোদিত ৫৫৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে। জমি হস্তান্তরের পরও স্থানীয় কিছু আপত্তির মুখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিকল্প কোনো স্থান না খুঁজে পুরো প্রকল্পটিই বাতিল করে দেয়। স্থানীয় জটিলতা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা কিংবা বিকল্প স্থানে প্রকল্পটি সরিয়ে নেওয়া যেত; কিন্তু তা না করে এক যুগের প্রচেষ্টা একঝটকায় বাতিল করে দেওয়া প্রশাসনের চরম অদক্ষতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকেই প্রকাশ করে।

উন্নয়ন প্রকল্প মানে কেবল বড় বড় দালানকোঠা নির্মাণ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশ। তাই বরিশাল ও রংপুরের প্রকল্প দুটিকে আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আমদানিসামগ্রী এনে চলতি বছরের মধ্যেই চালু করতে হবে। একই সঙ্গে খুলনার বাতিল হওয়া প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করে একটি উপযুক্ত বিকল্প স্থানে দ্রুত পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শত শত কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় প্রকল্পগুলো যেন আমলাতান্ত্রিক গ্যাঁড়াকলে পড়ে আলোর মুখ দেখার আগেই নিভে না যায়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।