সোশ্যাল মিডিয়া থেকে টেলিভিশন, পত্রপত্রিকা চারদিকে এখন শুধু নরওয়েজীয় গোলমেশিন আর্লিং হলান্ডের জয়ধ্বনি। কয়েক দিন ধরে ফেসবুক স্ক্রল করলেই হলান্ডের কোনো না কোনো ভিডিও চোখে পড়ছে। কেউ তাঁর মিমিক্রি করছে। কেউ ভাইকিংসের ড্রামের তালে তালে উপস্থাপন করছে তাঁর ক্রীড়ানৈপুণ্য।

২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁকে ঘিরে নর্স যোদ্ধা বা ‘আধুনিক ভাইকিং’ ইমেজের যে তুমুল প্রচারণা, তা কি শুধুই স্বতঃস্ফূর্ত জনপ্রিয়তা, নাকি এক সচেতন বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং? উঁচু, ফরসা, পেশিবহুল শরীর আর অর্গানিক জীবনযাপনের এই আখ্যানের নেপথ্য কারণ খুঁজতে শুধু মিডিয়া তত্ত্বে আটকে থাকা যায় না। এর পেছনে জড়িয়ে আছে স্পনসরদের মুনাফা আর খোদ ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক পুঁজির এক দীর্ঘ ইতিহাস।

মূলত এক নিটোল ও বিতর্কমুক্ত মহাতারকা নির্মাণ এই সময়ে কেন জরুরি হয়ে উঠেছে, তার উত্তর তিনটি স্তরে খোঁজা যেতে পারে। প্রথমত, তারকা তৈরির তাত্ত্বিক কাঠামোটা কেমন—মিডিয়া কীভাবে একজন খেলোয়াড়ের শরীর ও জাতিসত্তাকে একটা বিক্রয়যোগ্য মিথে রূপান্তর করে।

দ্বিতীয়ত, এই প্রক্রিয়ায় বর্ণ ও জাতীয়তার রাজনীতি কীভাবে কাজ করে—একজন সাদা, নর্ডিক খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে সেই রাজনীতি অন্য বর্ণের তারকাদের তুলনায় কীভাবে ভিন্নভাবে হাজির হয়। তৃতীয়ত, এই পুরো তারকা-অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট—ফিফা কীভাবে তারকাদের ব্যবহার করে নিজের নগদ পুঁজি আর বৈশ্বিক ভাবমূর্তি দুটোই বাড়ায়।

.বিশ্বকাপ ফুটবল যেমন হওয়া উচিত, যেমন হচ্ছে.

রোলাঁ বার্থ তাঁর মিথোলজিস গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, আধুনিক গণমাধ্যম কীভাবে সামাজিকভাবে নির্মিত একটা অর্থকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘চিরন্তন’ হিসেবে হাজির করে। একজন ফুটবলারকে ‘আধুনিক ভাইকিং’ আখ্যা দেওয়া মানে তাঁর শরীর, উচ্চতা, বর্ণ ও জাতীয়তাকে একটা আগে থেকে পরিচিত সাংস্কৃতিক গল্পের ছাঁচে বসিয়ে দেওয়া, যা দর্শকের কাছে সহজবোধ্য ও আবেদনময়।

এজেন্ডা সেটিংয়ের নিকাশ অনুযায়ী আমরা দেখি যে মিডিয়া সরাসরি কাউকে কিছু নিয়ে ভাবতে বলে না; কিন্তু বারবার প্রচারের মধ্য দিয়ে সে ঠিক করে দেয় যে আপনি কোন বিষয় নিয়ে ভাববেন। মাঠের বাইরে হলান্ডকে ঘিরে ভাইকিং ইমেজারি ঠিক তেমনি একটা ন্যারেটিভ ফ্রেমিং।

তবে এই প্রক্রিয়া নতুন কিছু নয়। নিল ব্লেইন ও হিউ ও’ডনেলের গবেষণা (গেমস উইদাউট ফ্রন্টিয়ার্স সংকলনে, ১৯৯৪) দেখিয়েছিল, নব্বইয়ের দশকের ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম কীভাবে ইতালি ’৯০ বিশ্বকাপ ও উইম্বলডনে খেলোয়াড়দের জাতীয়তার ওপর ভিত্তি করে একধরনের ‘টাইপ’ বানিয়ে ফেলত। সুইডিশ টেনিস তারকা স্টেফান এডবার্গকে বারবার দেখানো হতো নর্ডিক ‘শীতলতা’ আর ‘পরিচ্ছন্নতা’র প্রতীক হিসেবে, যেখানে আর্জেন্টাইনদের বর্ণনা করা হতো মেজাজি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন হিসেবে।

গবেষকদ্বয় দেখান, খেলোয়াড়ি দক্ষতার সঙ্গে জাতীয় পরিচয়ের এই মিশ্রণ একটা ‘বিশেষভাবে শক্তিশালী অর্থবহনকারী সমন্বয়’ তৈরি করে—জার্মান খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যেমন বারবার সামরিক-শৃঙ্খলার আখ্যান হাজির হতো। হলান্ডের ভাইকিং-ব্র্যান্ডিং তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—এটি একই ধরনের জাতিভিত্তিক ‘টাইপ-কাস্টিংয়ের’ হালনাগাদ সংস্করণ, যেখানে নর্ডিক শীতলতার জায়গায় বসেছে ভাইকিং শক্তিমত্তার আখ্যান।

.

ব্লেইন ও ও’ডনেল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেন—খেলাধুলার তারকা তৈরির প্রক্রিয়া হলিউডি স্টার-সিস্টেমের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রিচার্ড ডায়ারের কাজ উদ্ধৃত করে তাঁরা বলেন, সিনেমার তারকাদের মতোই ক্রীড়া তারকাদের সাফল্যের পেছনে যুক্তিসংগত কোনো একক ব্যাখ্যা থাকে না—নিছক খেলার দক্ষতা যথেষ্ট নয়, দরকার হয় এমন এক ‘পার্সোনা’, যা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মুহূর্তের চাহিদা পূরণ করে।

আশির দশকে ম্যারাডোনা যেমন লাতিন আমেরিকার প্রতারিতবোধ করা মানুষের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি ১৯৯০ বিশ্বকাপের ইউরোপীয় সংবাদপত্রগুলো তাঁকে রীতিমতো দেবতায় রূপান্তরিত করেছিল—ফরাসি দৈনিক ‘France-Soir’ তাঁকে ডেকেছিল ‘ঈশ্বর’, সোভিয়েত সংবাদপত্র লিখেছিল তিনি ‘অতিমানবীয় শক্তি’ অর্জন করেছেন। একই প্রক্রিয়ায় আজ হলান্ডকে ভাইকিং-দেবতার আদলে গড়া হচ্ছে—  পার্থক্য শুধু এই যে ম্যারাডোনার মিথ তৈরি হয়েছিল বঞ্চনার আখ্যান থেকে, হলান্ডের মিথ তৈরি হচ্ছে শারীরিক-জাতিগত আধিপত্যের আখ্যান থেকে।

.বিশ্বকাপ ২০২৬: স্পন্সরশিপের আড়ালে যে রাজনীতি লুকিয়ে আছে.

এখানেই তারকা নির্মাণের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকটা সামনে আসে। ব্যারি স্মার্টের ‘দ্য স্পোর্ট স্টার’ গ্রন্থে মাইকেল জর্ডানের ব্র্যান্ডিং নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে, যা দেখায় বর্ণ কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন তারকার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে কাজ করে।

ড্যান অ্যান্ড্রুজের গবেষণা উদ্ধৃত করে স্মার্ট দেখান, জর্ডানের ক্ষেত্রে মিডিয়া-বিপণন তাঁর কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে খাটো করে তাঁকে ‘বর্ণনাতীত’ (বিয়ন্ড রেইস) ও ‘সর্ব-আমেরিকান’ রূপে হাজির করেছিল—যেন তিনি ‘না কালো, না সাদা’।

এই প্রক্রিয়ায় চারটি স্বতন্ত্র মুহূর্ত চিহ্নিত করা যায়: প্রথমত, তাঁর ‘স্বাভাবিক অ্যাথলেটিসিজম’-এর আখ্যান (কেন সাদারা লাফাতে পারে না অথচ জর্ডান পারেন); দ্বিতীয়ত, তাঁকে রেগানপন্থী ‘জাতিগত প্রতিলিপি’ হিসেবে গড়ে তোলা, যা বর্ণবাদী মার্কিন বাজারের স্বস্তির জন্য তাঁর কৃষ্ণাঙ্গত্বকে আড়াল করেছিল; তৃতীয়ত, তাঁর সহকর্মী চার্লস বার্কলির মতো অন্য কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য তৈরি করে জর্ডানকে ‘সদ্‌গুণের প্রতিমূর্তি’ বানানো, যেখানে বার্কলিকে বানানো হয়েছিল ‘হুমকিস্বরূপ কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ’-এর স্টেরিওটাইপ।

অ্যান্ড্রুজ নিজেই সতর্ক করেছিলেন, এই ‘বর্ণাতীততার’ আখ্যান আসলে মার্কিন বর্ণবাদী কাঠামোর বাস্তবতাকে আড়াল করার একটা কৌশল, যেখানে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকা জর্ডানের অস্তিত্ব নিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করে, অথচ যারা ‘মাইকের মতো’ হতে পারেনি তাদের প্রতি আরও নিষ্ঠুর হয়।

.

হলান্ডের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা উল্টো দিক থেকে কাজ করে, কিন্তু কাঠামোগতভাবে একই ধরনের বর্ণনির্ভর টাইপ-কাস্টিং। জর্ডানের বর্ণকে যেখানে আড়াল করে ‘বর্ণনাতীত’ বানানো হয়েছিল, হলান্ডের ক্ষেত্রে তাঁর শ্বেতাঙ্গ, নর্ডিক শরীরকেই সরাসরি উদ্‌যাপনের বিষয় বানানো হচ্ছে—উচ্চতা, শারীরিক শক্তি, ‘প্রাকৃতিক’ যোদ্ধা-সত্তা সরাসরি তাঁর জাতিসত্তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, অনেকটা সেভাবেই যেভাবে জর্ডানের ক্ষেত্রে বলা হতো কৃষ্ণাঙ্গ শরীরের ‘স্বাভাবিক অ্যাথলেটিসিজম’।

দুটি প্রক্রিয়াই মিডিয়া-অধ্যয়নের ভাষায় ‘রেসিয়ালাইজড অ্যাসথেটিকস’-এর উদাহরণ—শরীর, উচ্চতা ও গায়ের রংকে সরাসরি সহজাত সত্তা বা যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা, যা শারীরিক নির্ধারণবাদের কাছাকাছি চলে যায়। পার্থক্য শুধু এই যে একটার ক্ষেত্রে বর্ণকে আড়াল করে বাজারযোগ্য করা হয়েছে, আরেকটার ক্ষেত্রে বর্ণকে সরাসরি প্রদর্শন করেই বাজারযোগ্য করা হচ্ছে—দুটিই একই বাণিজ্যিক যুক্তির দুই মুখ।

.

শরীরকে পণ্যায়নের ওপর লুকা বিফুলকোর বিস্তর গবেষণা রয়েছে। তাঁর গবেষণাপত্র দ্য সেলিব্রেটেড বডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে। বিশ শতকের ‘শিল্প-দেহ’ যুক্ত ছিল উৎপাদনশীলতা, পরিশ্রম, আত্মত্যাগ ও শৃঙ্খলার মতো মূল্যবোধের সঙ্গে—অ্যাথলেট তাঁর শরীরকে কষ্ট করে গড়তেন এবং তার বিনিময়ে প্রশংসা পেতেন।

কিন্তু সমকালীন সময়ে দেহের মূল্যায়ন সরে এসেছে নান্দনিকতা, সৌন্দর্য ও দৃশ্যমানতার দিকে—বিফুলকো দেখান, খ্যাতি এখন আর শুধু কৃতিত্বের ওপর নির্ভর করে না, নিছক দৃশ্যমানতাই যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারে। ক্রিস রোজেকের ভাষায় যাকে বলে ‘অ্যাচিভ্‌ড’ (অর্জিত) খ্যাতির পাশাপাশি ‘অ্যাট্রিবিউটেড’ (আরোপিত) খ্যাতির গুরুত্ব বেড়েছে বহুগুণ।

হলান্ডের ব্র্যান্ডিং এই দুই ধরনের খ্যাতির এক অস্বাভাবিক মিশ্রণ। তাঁর গোলসংখ্যা প্রশ্নাতীত—এই অর্থে তাঁর খ্যাতি ‘অর্জিত’। কিন্তু ভাইকিং-আখ্যান, তাঁর শারীরিক গড়ন, তাঁর ‘প্রাকৃতিক’ জীবনযাপনের গল্প—এসব যুক্ত হচ্ছে ‘আরোপিত’ খ্যাতির স্তর হিসেবে, যা তাঁর বাজারমূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিফুলকো দেখান, ডেভিড বেকহ্যামের উদাহরণে কীভাবে একজন খেলোয়াড় ‘মোবাইল বিজ্ঞাপন’-এ পরিণত হন—তাঁর শরীর হয়ে ওঠে বদ্রিয়ারের ভাষায় ‘সাইন এক্সচেঞ্জ’-এর বস্তু, যেখানে দেহ নিজেই একটা চিহ্ন হিসেবে বাজারে বিনিময় হয়।

হলান্ডের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে—তাঁর শরীর নিজেই এখন একটা ব্র্যান্ড, যার সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে পুষ্টি-সচেতনতা, শৃঙ্খলা, ভাইকিং-শক্তির মতো বিক্রয়যোগ্য অর্থ। ফ্যানরা এই দেহের ভোক্তা হয়ে ওঠেন, দর্শক-ভক্তরা এই ইমেজের মধ্য দিয়ে নিজেদের পরিচয়ের একটা অংশ কিনে নেন—বিফুলকোর ভাষায়, এটাই সমকালীন ‘সেলিব্রেটেড বডি’ বা পণ্যায়িত দেহ।

.ফিফার রাজনীতি যেভাবে এবারের বিশ্বকাপকে বিতর্কিত করছে.

তারকা-মিথ ও ফিফার রাজনীতি বুঝতে ইতিহাস পাঠ জরুরি। ১৯৩৪ সালে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী ইতালি রেফারি বাছাইয়ে হস্তক্ষেপ ও রোমান সাম্রাজ্যের প্রচারণায় বিশ্বকাপকে হাতিয়ার করে। একইভাবে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল ভিদেলা পেরুর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ৬-০ গোলের জয়সহ পুরো টুর্নামেন্টকে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেন।

২০১৫ সালে জুরিখে ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের ঘটনা এবং রাশিয়া (২০১৮) ও কাতারকে (২০২২) আয়োজক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় ঘুষের অভিযোগ ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকে আরও একবার প্রশ্নবিদ্ধ করে। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপেও ডায়নামিক টিকিট প্রাইসিং নিয়ে বিতর্ক এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধে একজন খেলোয়াড়ের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা একই ধারাবাহিকতার অংশ।

এই প্রেক্ষাপটেই হলান্ডের তারকা-নির্মাণকে বোঝা দরকার। ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ ধারণাটি মূলত ব্যাখ্যা করে কীভাবে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র ক্রীড়া-আয়োজনকে ব্যবহার করে নিজের সুনাম উজ্জ্বল করতে। কিন্তু একই কাঠামো কাজ করে ব্যক্তি-তারকার স্তরেও—  একজন নিখুঁত, বিতর্কমুক্ত, ‘প্রাকৃতিক’ তারকা তৈরি করা মানে টুর্নামেন্টের চারপাশের সব প্রাতিষ্ঠানিক কেলেঙ্কারি থেকে দর্শকের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া। ফিফার জন্য হলান্ড একটা আদর্শ ‘ক্লিন’ পণ্য—কোনো রাজনৈতিক বিবৃতি নেই, কোনো বিতর্ক নেই, শুধু গোল আর একটা সুন্দর দেখতে জাতিগত-সাংস্কৃতিক আখ্যান। জার্সি বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ চুক্তি—এই পুরো অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকে এমন এক তারকা, যাকে ঘিরে কোনো ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ আখ্যান নেই, শুধু বিক্রয়যোগ্য মিথ আছে।

.

মিডিয়া-অধ্যয়নের দৃষ্টিতে এই পুরো প্রক্রিয়ায় তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। প্রথমত, কমোডিফিকেশন—জাতিগত বা ব্যক্তিগত মিথকে জার্সি, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপের মতো পণ্যে রূপান্তর করা। দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত স্মৃতি—যে ইতিহাস ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে যায় না তা এড়িয়ে যাওয়া। ভাইকিংরাও বহুবার সিদ্ধান্তমূলকভাবে পরাজিত হয়েছে—৮৪৪ সালে কর্ডোবার উমাইয়া বাহিনীর কাছে সেভিয়া অভিযানে ভাইকিং নৌবহরের পরাজয়, কিংবা ১৬২৭ সালে বার্বারি জলদস্যুদের হাতে আইসল্যান্ডে চার শর বেশি মানুষের অপহরণ—এই ইতিহাস ভাইকিং-মিথের প্রচারণায় জায়গা পায় না। তৃতীয়ত, রেসিয়ালাইজড অ্যাসথেটিকস, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। জর্ডানের ক্ষেত্রে ‘বর্ণাতীততা’র আখ্যান দিয়ে বর্ণবাদী কাঠামোর বাস্তবতাকে আড়াল করা হয়েছিল বলে অ্যান্ড্রুজ যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে তুলনীয় একটা সতর্কবার্তা হলান্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য—  একজন শ্বেতাঙ্গ, নর্ডিক খেলোয়াড়ের ‘স্বাভাবিক’ শারীরিক আধিপত্যের আখ্যান জনপ্রিয় করা মানে পরোক্ষভাবে এমন একটা ধারণাকেই স্বাভাবিক করে তোলা যে নির্দিষ্ট শরীর, নির্দিষ্ট বর্ণ সহজাতভাবেই ‘যোদ্ধা’ বা ‘বিজয়ী’।

এ ধরনের আখ্যান যত নিরীহ বিনোদন মনে হোক না কেন, দীর্ঘ মেয়াদে তা শারীরিক নির্ধারণবাদের পুরোনো ধ্যানধারণাকেই নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনে।

.

আরেকটি ব্যাপার হলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, লুকা মদরিচ ও ম্যানুয়েল নয়ারের মতো ফুটবল কিংবদন্তিরা তাঁদের ক্যারিয়ারের ‘লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন। সামনের দিনগুলোয় স্টার নির্ধারণ করা ফিফার জন্য যেমন জরুরি। মিডিয়া, স্পনসর, ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যও দরকারি।

সবশেষে এই সমালোচনা যৌক্তিক জায়গা থেকে করা গেলেও এখানে একটি ব্যাপার স্পষ্ট করা দরকার, মিডিয়ার তারকা নির্মাণ বা ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে হলান্ড ব্যক্তি হিসেবে যা অর্জন করেছেন তাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাঁর গোলসংখ্যা, তাঁর পরিশ্রম বাস্তব।

সমস্যাটা তাঁর কৃতিত্বে নয়; বরং সেই কৃতিত্বের চারপাশে বোনা জাতিনির্ভর আখ্যানে এবং সেই আখ্যান যে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির স্বার্থে বারবার পুনরুৎপাদিত হয় তাতে। ব্যক্তি-তারকার মিথ আর প্রতিষ্ঠানের ‘নিরপেক্ষ ক্রীড়া-সংস্থা’ মিথ দুটিই একই ধরনের নির্বাচিত স্মৃতি ও কমোডিফিকেশনের ওপর দাঁড়িয়ে। সমালোচনামূলক মিডিয়া-সাক্ষরতা মানে তাই একটামাত্র মিথকে প্রশ্ন করা নয়; বরং ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আসা ‘সহজাত শ্রেষ্ঠত্ব’ বা ‘সহজাত নিরপেক্ষতা’র আখ্যানকে একই মাপকাঠিতে প্রশ্ন করতে পারা।

  • ফরহাদ নাইয়া কবি ও গণমাধ্যমকর্মী

    মতামত লেখকের নিজস্ব