একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষা কতটা পূরণ করতে পারছে, সে সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে সকালের সূর্য দেখে বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে, তেমনি বর্তমান জাতীয় সংসদের কার্যক্রমেও দেশবাসী খুব আশাবাদী হতে পারছেন বলে মনে হয় না।
সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনটি মূলত সাংবিধানিক বিতর্কে অতিবাহিত হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং গণভোটের রায় বনাম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রায়ের অগ্রাধিকার নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা ব্যস্ত ছিলেন। একে অপরকে ঘায়েল করার প্রচেষ্টায় জনজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো আলোচনায় তেমন স্থান পায়নি।
দ্বিতীয় অধিবেশনটি বাজেট কেন্দ্রিক ছিল। স্বাভাবিকভাবেই বাজেট প্রাধান্য পেলেও অনেক সংসদ সদস্যের আনাড়িপনার কারণে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে বারবার সতর্ক করতে হয়েছে। অনেকে একে নতুন সদস্যদের অভিজ্ঞতার অভাব বলে যুক্তি দিলেও, নতুনদের মধ্যেই কেউ কেউ নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।
সমস্যাটি হলো, আমাদের রাজনীতিকেরা জনগণের কথা বললেও বাস্তবে দলের চাওয়া-পাওয়াকেই প্রাধান্য দেন। ফলে সংসদে মেঠো বক্তৃতায় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করাকেই তাঁরা সাফল্য মনে করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব অনেকের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। অথচ ১৯৭২ সালের গণপরিষদের সদস্যরা নতুন হওয়া সত্ত্বেও সংবিধান নিয়ে এম এন লারমার যুক্তিতর্ক আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবিষয় হয়ে আছে।
জাতীয় সংসদে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি আদায়ের দুটি প্রধান পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর বা দৃষ্টি আকর্ষণের প্রস্তাবের মাধ্যমে জরুরি আলোচনা, যেখানে মন্ত্রীরা জবাব দিতে বাধ্য। দ্বিতীয়টি হলো সংসদীয় কমিটি। এই কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করেন, ফলে দলের পরিচয় ছাপিয়ে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি আদায় করাই মুখ্য হয়ে ওঠে। প্রকাশ্য অধিবেশনে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন হলেও সংসদীয় কমিটিতে তার সুযোগ থাকে। অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের আমলেই এমন উদাহরণ দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমেই নির্বাহী বিভাগের প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে সরকারের বয়স প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেলেও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ৩৯টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এখনো গঠিত হয়নি। এখন পর্যন্ত পরিকল্পনা, অর্থ এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক—এই তিনটি কমিটি গঠিত হয়েছে। পরিকল্পনা কমিটির সভাপতি হয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ড. আবদুল মঈন খান, অর্থ কমিটির সভাপতি বিএনপির প্রবীণ সদস্য মুশফিকুর রহমান এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক কমিটির সভাপতি হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। এসব কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্য রয়েছেন।
সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদ গঠনের প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যে সব স্থায়ী কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। ৫০টি কমিটির মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টি গঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ৮টি সংসদ-সংক্রান্ত। এছাড়া নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত কমিটিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে সদস্য করা হয়েছে, যা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে।
"রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের মতে, বাংলাদেশের সংবিধান আইন প্রণয়ন ও বাজেট অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংসদকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করেছে। নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই করার ব্যাপক এখতিয়ারও সংসদকে দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাহী বিভাগ সংসদের কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।"
চলতি অধিবেশন ১৫ জুলাই পর্যন্ত চলার কথা। ১১ জুলাই পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বাকি চার দিনের মধ্যে সংসদীয় কমিটি গঠন সম্ভব হবে না; এর জন্য পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কমিটির সভাপতি পদে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়া প্রবীণ বা নবীন সদস্যরা আসতে পারেন। তবে দেখার বিষয় হবে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে তাঁদের জানাশোনা এবং মন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনার আগ্রহ কতটুকু।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগের দায়িত্ব সংসদ নেতার, যিনি একই সঙ্গে সরকারপ্রধান। সংবিধান সংস্কারে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিটি সংসদপ্রধান ও নির্বাহী প্রধান আলাদা করার প্রস্তাব দিলেও বিএনপির দ্বিমতের কারণে তা গৃহীত হয়নি।
মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ এবং প্রতিবেশী ভারতে সরকারি হিসাব বা বিশেষ অধিকার সংক্রান্ত কমিটিতে বিরোধী দলের সভাপতি নিয়োগের প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশে তা হয়নি। পঞ্চম সংসদ পর্যন্ত মন্ত্রীরাই কমিটির সভাপতি হতেন, যা অনেকটা 'আসামি নিজেই বিচারক' হওয়ার মতো। সপ্তম সংসদে নিয়ম বদল হলেও স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের সভাপতি পদে বিরোধী দলকে রাখা হয়নি। সংস্কার পরবর্তী সময়ে এই চিত্র বদলায় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের দফা (২)-এ সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা ও কার্যাবলির বর্ণনায় বলা হয়েছে, কমিটি সংবিধান ও অন্য কোনো আইন সাপেক্ষে (ক) খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনগত প্রস্তাব পরীক্ষা করতে পারবে; (খ) আইনের বলবৎকরণ পর্যালোচনা এবং অনুরূপ বলবৎকরণের জন্য ব্যবস্থাদি গ্রহণের প্রস্তাব করতে পারবে; (গ) জনগুরুত্বসম্পন্ন বলে সংসদ কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিটিকে অবহিত করলে সে বিষয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজ বা প্রশাসন বিষয়ে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারবে।
নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের মূল হাতিয়ার হলো এই সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রতিটি কমিটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তের সুপারিশ করতে পারে। কিন্তু এই কমিটিগুলো গঠিত না হলে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনা অসম্ভব।
প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় অধিবেশনও শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিগুলো গঠিত না হলে জাতীয় সংসদ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই অসম্পূর্ণ সংসদ কবে সম্পূর্ণ হবে এবং কবে নির্বাহী বিভাগকে জনগণের নির্বাচিত সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে—সেই প্রশ্ন করার অধিকার জনগণের আছে।
—সোহরাব হাসান
সাংবাদিক ও কবি
(মতামত লেখকের নিজস্ব)






