প্রায়ই বলা হয়—মানুষই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কথাটি বারবার উচ্চারিত হয়। ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে আবারও এ সত্যটি মনে করিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক। তবে মানুষ যেমন সম্পদ হতে পারে, তেমনি কিছু পরিস্থিতিতে মানুষ হয়ে উঠতে পারে বোঝাও।
সুসংগঠিত মানবসম্পদ যে কোনো দেশের জন্য বিশেষ মূল্যবান। অর্থাৎ জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলেই সেটি দেশ ও সমাজের জন্য বড় শক্তিতে পরিণত হয়। এ রূপান্তরের প্রধান শর্ত হলো জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি। তবে সক্ষমতা উন্নয়নের অর্থ কেবল অর্থনৈতিক উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়ানো বা শ্রমশক্তি হিসেবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মধ্যে সীমিত নয়। অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও মানুষের সক্ষমতা বিকাশ করা জরুরি।
রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মানুষের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার বিকাশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাজনৈতিক আলোচনায় অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য রাজনৈতিক জ্ঞান ও দক্ষতার বিস্তারও দরকার। আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে জনপ্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টিও সামনে আসে। সার্বিকভাবে জীবনের নানা ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে জনসংখ্যা প্রকৃত অর্থে মানবসম্পদে রূপ নিতে পারে।
জন্মের সময় মানুষ বুদ্ধিগত বা মননগত কিছু অন্তর্নিহিত সক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সক্ষমতার পরিমাণগত ও গুণগত বিস্তার দরকার। সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষার লক্ষ্য শুধু সনদপ্রাপ্তি নয়; দক্ষতা অর্জন, গুণগত জ্ঞানের বিস্তার এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করাও শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। শিক্ষার পাশাপাশি প্রশিক্ষণও মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
তরুণ জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথও এখানেই। মানবসম্পদ গঠনে শিক্ষার সঙ্গে স্বাস্থ্যেরও বড় ভূমিকা আছে। সুস্বাস্থ্য ও সুপুষ্টি মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামগ্রিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। বলা যায়, মানব সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সামাজিক সেবাসমূহের ভূমিকা বড়। ব্যক্তিমানুষের সক্ষমতা বিকাশে সামাজিক যূথবদ্ধতা ও যৌথতাও সহায়ক। সমাজের ভেতরে আমাদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ভাবের আদান-প্রদান প্রতিটি মানুষকে শাণিত ও ঋদ্ধ করে—এটিও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি উপায়।
তবে প্রশ্ন থাকে: কোন পরিস্থিতিতে সম্পদ না হয়ে জনসংখ্যা দায় হয়ে ওঠে? তিনটি মাত্রায় সেই ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—প্রথমত, মানুষের সক্ষমতা না বাড়লে; দ্বিতীয়ত, পূর্ব-অর্জিত সক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে বা অব্যবহৃত থাকলে; এবং তৃতীয়ত, সক্ষমতা অসমভাবে গড়ে উঠলে। একজন মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি হয় নিজের উদ্যোগ, পারিবারিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। ব্যক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ইচ্ছা সব মানুষের ভেতরেই সমানভাবে সুপ্ত থাকে না; কারও মধ্যে তা সহজাত নয়। পরিবারও সক্ষমতা বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে—পারিবারিক শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং মনন একজন মানুষের সক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা বৃদ্ধিতেও পরিবার সহায়তা করে। পাশাপাশি রাষ্ট্র একটি আবশ্যকীয় প্রতিষ্ঠান; নীতিমালা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র এমন একটি সামষ্টিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে মানুষের সক্ষমতা বিকাশের শর্ত তৈরি হয়। এসব অনুপস্থিত থাকলে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটে না।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ঔদাসীন্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সুযোগ-সুবিধাদির বিশাল সংকোচন, সমাজে রক্ষণশীল মতবাদের প্রসারণ ইত্যাদি বিষয় বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হার আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে আরও দুরূহ করে তুলবে।
আর কখনো কখনো অর্জিত সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে বা অব্যবহৃত থেকে যায়। বহু দেশে দেখা গেছে, বহুদিনের প্রচেষ্টায় মানুষের একটি মানসম্পন্ন সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সেই সক্ষমতা ব্যবহারের উপযোগী সুযোগ না থাকলে অর্জিত সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে একসময় অক্ষমতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সক্ষমতা গড়ে ওঠার পাশাপাশি সেটিকে কাজে লাগানোর জন্য যথাযথ সুযোগও দরকার। সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু সুযোগ তৈরি হয়নি—এমন অবস্থায় অর্জিত যোগ্যতা জনমনে দীর্ঘস্থায়ী হতাশা ও ক্ষোভকে জমিয়ে দিতে পারে।
সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। সক্ষমতা যদি অসমভাবে গড়ে ওঠে—যেখানে সব জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা সমভাবে বিকশিত হয়নি—তখনও একটি দেশ বা সমাজের সামগ্রিক সক্ষমতা চূড়ান্তভাবে পূর্ণ রূপ নিতে পারে না। বহু দেশ ও সমাজে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বা প্রান্তিক মানুষের সক্ষমতা গড়ে তোলার পেছনে পর্যাপ্ত নজর ও মনোযোগ থাকে না। ফলে সেসব জনগোষ্ঠীর মানবসম্পদ গঠনের সম্ভাবনা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা বনাম জনসম্পদের আলোচনা আনলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, বাংলাদেশের মানুষের কর্মকুশলতা, সৃষ্টিশীলতা এবং সৃজনশীলতার প্রশংসা যথেষ্ট হলেও মানবসম্পদের সীমাবদ্ধতাও বারবার আলোচনায় উঠে আসে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়—বাংলাদেশ মূলত অদক্ষ শ্রমিকদেরই মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব শ্রমিকের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। এমনকি ন্যূনতমভাবে স্থানীয় ভাষাটিও তারা রপ্ত করতে পারে না। ফলে তাদের দৈনন্দিন যাপিত জীবনের বহু বিষয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে প্রতিবেশী বহু রাষ্ট্রের শ্রমিকেরা মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমিকদের চেয়ে বিভিন্ন মাত্রিকতায় বেশি আয় করে—যেখানে তাদের সক্ষমতা আমাদের শ্রমিকদের তুলনায় বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
দ্বিতীয়ত, অর্জিত সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে অব্যবহৃত থাকে, অর্থাৎ সক্ষমতা অর্জন হয় কিন্তু সেটির অপচয়ও ঘটে। উচ্চশিক্ষার উদাহরণ টেনে বলা হয়—বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সনদপ্রাপ্ত হন। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ৩ লাখের কর্মনিয়োজন ঘটে। একই সঙ্গে উপাত্তের ভিত্তিতে বলা হয় যে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতরাই সবচেয়ে বেশি বেকার। সক্ষমতা এবং মানবসম্পদের এই ধরনের অপচয়কে একটি বড় সংকট হিসেবে দেখা হয়।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সনদ প্রদান অভিমুখী, মানবসম্পদ গঠন অভিমুখী নয়। ফলে সনদ নিয়ে বিদ্যায়তন থেকে বেরিয়ে আসা তরুণ-তরুণীরা বিভিন্ন ধরনের অন্তরায়ের মুখোমুখি হন। শ্রমবাজারে যেসব দক্ষতার চাহিদা বিদ্যমান, সেসব দক্ষতা সনদপ্রাপ্তদের মধ্যে থাকে না—এ অভিযোগ নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কথায় উঠে আসে। আবার, প্রকৃতি ও প্রক্রিয়া—দুই দিক থেকেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার বদলাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের ফলে বিশ্ব শ্রমবাজারের ধরনও বদলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণ-তরুণীরা। পাশাপাশি মননের দিক এবং মূল্যবোধের দিক থেকে সক্ষমতা বাড়ছে না বলেও বলা হয়, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদপ্রাপ্তদের মধ্যে। বেকারত্ব উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি করে, যার ফলে রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক সক্ষমতার সংকটও দেখা দেয়—এবং সেই সঙ্গে মানবসম্পদের সংকটও গভীর হতে থাকে।
পাঁচ নম্বর বিষয় হিসেবে বলা হয়—শিক্ষার সুযোগের অসমতার কারণে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে গড়ে ওঠে না। এই অসমতা সমাজের সার্বিক অসমতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের মানবসম্পদের সংকট দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখা দরকার। এক. মোট জনসংখ্যায় তরুণ জনগোষ্ঠীর স্ফীতি, এবং দুই. জনমৈতিক লভ্যাংশ। প্রথম বিষয়ে বর্তমান পরিস্থিতি হিসেবে বলা হয়—বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। সেক্ষেত্রে জনসংখ্যার দিক থেকে ২০ কোটি লোকের দেশে এটি একটি বিরাট সংখ্যা। আবার এর মধ্যে ৮৬ লাখ তরুণ-তরুণী শিক্ষা, কর্মনিয়োজন কিংবা প্রশিক্ষণে নেই। ফলে মানবসম্পদ গঠনে ঘাটতির পাশাপাশি মানবসম্পদের অপচয়েরও একটি মাত্রিকতা রয়েছে। দ্বিতীয় মাত্রিকতায় বলা হয়—বাংলাদেশে জনমনৈতিক লভ্যাংশের যে সুযোগ ছিল, তা হারিয়ে গেছে, কারণ প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ সময়মতো গড়ে তুলতে পারেনি।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের জনসংখ্যার বলয়ে একটি অশনিসংকেত দেখা দেয় বলেও আলোচনায় উঠে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৪ শতাংশ। গত ৪০-৪৫ বছরে জনসংখ্যা আস্তে আস্তে কমে দীর্ঘদিন তা কমের দিকেই ছিল। এখন তা বৃদ্ধির দিকে—এ কথা বলা হয়।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ঔদাসীন্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সুযোগ-সুবিধাদির বিশাল সংকোচন, সমাজে রক্ষণশীল মতবাদের প্রসারণ—এসব বিষয় বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হার আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে আরও দুরূহ করে তুলবে।
২০২৬ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে এ দেশের ভাবনা দ্বিমুখী হওয়া উচিত—একদিকে কীভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হারের প্রবণতাকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়; অন্যদিকে কীভাবে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা যায়।
সেলিম জাহান জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক।
* মতামত লেখকের নিজস্ব






