বাংলাদেশে দালাল অর্থাৎ আদম ব্যবসায়ীদের খপ্পরে না পড়ে নিরাপদে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া এখনো সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়নি কেন—এই প্রশ্ন আমাদের সবাইকে করতে হবে। সরকারি কাঠামো আছে কাগজে ও কেন্দ্রে; কিন্তু দালাল আছে মাঠে, দরিদ্র যুবকের দরজায়। এই দূরত্ব ঘোচাতে না পারলে প্রবাসী শ্রমিকেরা শোষণ, প্রতারণা ও বৈষম্যের শিকার হতেই থাকবেন।

অথচ এই প্রবাসীরাই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাঁরা দেশে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবারভিত্তিক আয় এবং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় তাঁদের অবদান এত বড় হওয়া সত্ত্বেও বিদেশে কর্মসংস্থানের যাত্রাটি এখনো নিরাপদ, সহজলভ্য ও দালালমুক্ত করা যায়নি—এটি রাষ্ট্রের একটি বড় ব্যর্থতা। তাই বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে শুধু ব্যক্তিগত ভাগ্য বদলের পথ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; এটিকে জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

.

প্রবাসী শ্রমিকদের সহায়তার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে—বিএমইটি, বোয়েসেল, ডেমো অফিস, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। ডিজিটাল দিক থেকেও ওইপি-বিএমইটি প্ল্যাটফর্ম এবং আমি প্রবাসী অ্যাপের মতো উদ্যোগ আছে। কিন্তু কাগজের কাঠামো আর মাঠের বাস্তবতা এক জিনিস নয়।

বিশ্বব্যাংকের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিএমইটির একাধিক ডেটাবেজ পরস্পর সংযুক্ত নয়; ফলে শ্রমবাজারের পূর্ণাঙ্গ তথ্যব্যবস্থা শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ডেমো অফিসগুলোর সক্ষমতাও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর মতো নয়।

সিপিডির ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে ১১ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেলেও সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলের মাধ্যমে গেছেন মাত্র ১৫ হাজার ২৯৪ জন, অর্থাৎ মোটের মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ। এই একটি সংখ্যাই বলে দেয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মাঠে কতটা ব্যর্থ।

তাই সিলেটের রাজু কিংবা কুড়িগ্রামের এক দরিদ্র যুবক যখন বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, সে প্রথমেই বিএমইটি অফিসে যায় না; যায় পাশের বাড়ির পরিচিত দালালের কাছে। কারণ, দালাল তার চেনা মানুষ। সে বাড়িতে গিয়ে কথা বলে, ভরসা দেয়, কাগজপত্রের পথ দেখায়, এমনকি টাকার জোগাড়ের ব্যবস্থাও বাতলে দেয়।

এই পরিচয়, ভরসা ও অসহায়ত্বের সুযোগ দালাল নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে—কখনো অতিরিক্ত টাকা নেয়, কখনো ভুয়া প্রতিশ্রুতি দেয়, কখনো ঋণের ফাঁদে ফেলে। দালালকে আইন করে নিষিদ্ধ করলেই দালাল শেষ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রকে দালালের চেয়েও সহজ, সস্তা ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে মানুষের দরজায় পৌঁছাতে হবে।

.প্রবাসী আয় বেড়েছে, বেড়েছে ফেরত আসা শ্রমিক.

দালাল টিকে থাকে শেষ মাইলের সমস্যাটা মেটায়। সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ ও সরকারি ব্যবস্থার মাঝখানে যে বিশাল একটা দূরত্বের ফাঁক থেকে যায়, সেটাই হলো লাস্ট মাইল প্রবলেম বা শেষ মাইল সমস্যা। এই ফাঁকটা রাষ্ট্র পূরণ করতে পারে না বলেই দালালরা সেই সুযোগ নেয় এবং সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। এই সমস্যাটার মেটানোর বিনিময়ে দালাল যে মাশুল আদায় করে, তা অস্বাভাবিক রকম বেশি।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশযাত্রার গড় খরচ প্রায় চার লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যার বড় অংশ যায় মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে। আইটিইউসির জরিপও বলছে, গ্রামাঞ্চলে নিয়োগ প্রায়ই মৌখিকভাবে হয়; না থাকে রসিদ, না থাকে প্রমাণ। ফলে প্রতারিত হলে আইনি প্রতিকারের পথ কঠিন হয়ে পড়ে। এই ক্ষতি শুধু একজন শ্রমিকের নয়; এটি তার পরিবার ও একটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও ক্ষত।

.

১. দূতাবাসে শ্রমবাজার উন্নয়ন সেল (লেবার মার্কেট ডেভেলপমেন্ট সেল-এলএমডিসি): প্রতিটি দূতাবাস ও হাইকমিশনে এই এলএমডিসি বিশেষ সেল গঠন করতে হবে, যার কাজ শুধু অভিযোগ শোনা নয়; নতুন চাকরির বাজার খোঁজা। কোন দেশে কোন খাতে শ্রমিকের চাহিদা, কোন কোম্পানি সরাসরি কর্মী নিতে আগ্রহী—এসব তথ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগ্রহ করতে হবে।

২. বিদেশি নিয়োগকর্তাদের জন্য ওয়ান-স্টপ সহায়তা: বড় কোম্পানি, হাসপাতাল, কেয়ার হোম, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, কৃষি কোম্পানি, হোটেল গ্রুপ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দূতাবাস সরাসরি যোগাযোগ করবে। নিয়োগকর্তারা বাংলাদেশে এসে সাক্ষাৎকার নিতে চাইলে বিমানবন্দর সহায়তা, অনুবাদক, ইন্টারভিউ বুথ, স্কিল টেস্ট, চুক্তি যাচাই ও সরকারি সমন্বয় এক জায়গা থেকে দিতে হবে। লক্ষ্য হবে—নির্বাচিত কর্মী যেন চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিদেশে যেতে পারেন।

.

৩. কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রণোদনা: কোন দূতাবাস কতটি নতুন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করল, কতটি যাচাইকৃত চাকরির সুযোগ তৈরি করল এবং কতজন শ্রমিক নিরাপদে কর্মসংস্থানে গেলেন—এসব সূচকে কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। সফল কর্মকর্তাদের জন্য স্বচ্ছ কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রণোদনা, সম্মাননা বা পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার রাখা যেতে পারে। তবে এটি কমিশন বা শুধু সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা হবে না; শ্রমিকের নিরাপত্তা ও চুক্তির স্বচ্ছতাই হবে প্রধান মাপকাঠি।

৪. উপজেলা সহায়তা কেন্দ্র: নতুন আমলাতন্ত্র নয়; বিএমইটি, ডেমো, বোয়েসেল, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে এক ছাতার নিচে এনে প্রতিটি উপজেলায় ‘নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থান সহায়তা কেন্দ্র’ করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট দিনে ভ্রাম্যমাণ সেবা ক্যাম্প করা যেতে পারে।

৫. খরচ ও তথ্যের স্বচ্ছতা: যাচাইকৃত চাকরির তথ্য সহজ বাংলায় প্রকাশ করতে হবে—দেশ, কাজ, বেতন, সরকারি ফি, এজেন্সি ফি, প্রশিক্ষণ ও মেডিক্যাল খরচ। প্রতিটি খরচ অফিসের বোর্ডে ও অনলাইনে টাঙাতে হবে। স্থানীয় সহায়তাকারী থাকলে তাকে বিএমইটির অধীনে নিবন্ধিত, প্রশিক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে; ফি নির্ধারিত ও রসিদ বাধ্যতামূলক হবে।

.ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার পথে বাধা কোথায়.

৬. চুক্তি যাচাই ও সুরক্ষা: প্রতিটি চাকরির চুক্তি বাংলায় অনুবাদ করে শ্রমিককে বুঝিয়ে দিতে হবে এবং কেন্দ্র থেকে যাচাই সনদ দিতে হবে। বিদেশযাত্রার আগেই শ্রমিকের পরিবার, নিয়োগকর্তা, কাজের ধরন, বেতন ও দূতাবাস-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল রেকর্ডে রাখতে হবে, যাতে বিপদে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।

৭. বোয়েসেল, প্রশিক্ষণ ও ঋণ সম্প্রসারণ: বোয়েসেলকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়নির্ভরতা থেকে বের করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চাকরি মেলা, ভার্চ্যুয়াল ইন্টারভিউ বুথ ও নিয়োগকর্তার ডেটাবেজসহ সম্প্রসারিত করতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ বিদেশের প্রকৃত শ্রমচাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে শুধু সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।

বিএমইটির বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে প্রস্তাবিত একটি কেন্দ্রীয় ‘শ্রম-দক্ষতা ও বাজার তথ্য সেল’ গড়ে তুলে এসব কেন্দ্রকে আধুনিক স্কিল সেন্টারে রূপান্তর করতে হবে। দূতাবাস ও হাইকমিশনের শ্রমবাজার উন্নয়ন সেল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোন দেশে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ করে কারিকুলাম, যন্ত্রপাতি, ভাষা শিক্ষা ও প্রশিক্ষকদের দক্ষতা আপডেট করতে হবে। প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও নিয়োগপ্রক্রিয়াকেও এক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের স্বল্প সুদের ঋণ যেন দালাল ছাড়া সরাসরি নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থান সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে পাওয়া যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

.

সবশেষে, প্রচারণা পৌঁছাতে হবে মানুষের নিজের জায়গায়—মসজিদের জুমার ঘোষণা থেকে ইউনিয়ন পরিষদের সভা, স্কুল-কলেজের অভিভাবক সমাবেশ থেকে হাটবাজারের বুথ পর্যন্ত। শুধু সরকারি ওয়েবসাইট বা ফেসবুক বিজ্ঞাপনে প্রচারণা আটকে রাখলে চলবে না।

রাষ্ট্রের হাতে কাঠামো আছে, প্রযুক্তি আছে। যা নেই, তা হলো শেষ মাইলের সংযোগ। সেই ফাঁক যদি রাষ্ট্র নিজেই পূরণ করতে পারে—সহজ, স্বচ্ছ ও মানুষের দরজার কাছাকাছি গিয়ে—তাহলে দালাল চক্র দুর্বল হবেই। রেমিট্যান্স চাইলে রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের পথও রাষ্ট্রকেই নিরাপদ ও সহজ করতে হবে। তা না করতে পারলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; রাষ্ট্রের জন্য এক বড় নৈতিক লজ্জাও বটে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

শেষ কথা হলো, প্রস্তাবিত নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থান সহায়তা কাঠামো বাস্তবায়নে অর্থের জোগানকে বড় বাধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রবাসী শ্রমিকেরা বছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন। এই আয়ের অতি সামান্য অংশও যদি তাঁদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, তথ্যসেবা, আইনি সহায়তা, সরকারি উদ্যোগে বৈদেশিক শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও চাকরির চাহিদা সংগ্রহ এবং দালাল চক্র প্রতিরোধে বরাদ্দ করা হয়, তাহলে একটি কার্যকর জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এটি ব্যয় নয়; রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।

  • মহিউদ্দিন আহমেদ কানাডাপ্রবাসী অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব