ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ দীর্ঘ সাত বছর ধরে ঝুলে থাকার পর শেষ পর্যন্ত কাটছাঁট করতে হয়েছে। এই ঘটনাটি আমাদের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার চরম অদক্ষতা এবং দূরদর্শিতার অভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তায় নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, পরিবেশগত উন্নয়ন এবং পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। তবে তিনবার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ পাওয়ার পরও এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাংক আর সময় বাড়াতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ২৬০ কোটি টাকার দুটি বড় কাজ—কামরাঙ্গীরচরের লোহারপুল পুনর্নির্মাণ এবং শাহজাহানপুর ঝিল দৃষ্টিনন্দন করার পরিকল্পনা প্রকল্প থেকে বাদ দিতে হয়েছে, যা একটি মেগা সিটির টেকসই উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায়।
যেকোনো প্রকল্পের সাফল্যের জন্য সঠিক কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই অপরিহার্য। কিন্তু ডিএসসিসি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে গুরুত্ব না দিয়ে অনুমানের ভিত্তিতে নকশা চূড়ান্ত করেছিল। ফলে অনুমোদনের পর দেখা যায়, নকশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। জমি সংক্রান্ত জটিলতা এবং নকশা সংশোধন করতেই বছরের পর বছর সময় নষ্ট হয়েছে। এর পাশাপাশি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, প্রকল্প শুরুর পাঁচ বছর পরও ডিএসসিসি ঋণের মাত্র ২০ শতাংশ ছাড়াতে পেরেছিল, যা তাদের ক্রয়প্রক্রিয়া ও তদারকির পদ্ধতিগত ব্যর্থতারই প্রমাণ।
এই ধরনের অপেশাদারতার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। প্রকল্প পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হলেও পরামর্শক ফি, যানবাহন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়েছে ৬৮ কোটি টাকা। এখন বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ায় অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করতে সরকারের নিজস্ব তহবিল বা অন্য প্রকল্প থেকে অর্থ এনে জোড়াতালি দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ, কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে একই কাজের পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থের একাধিকবার অপচয় হচ্ছে।
উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর প্রায়ই সামনে আসলেও দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা নেই। প্রকল্প ব্যর্থ বা অসম্পূর্ণ হলেও সংশ্লিষ্টদের ছাড় দেওয়ার এক ক্ষতিকর সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে, যার ফলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ডিএসসিসির এই দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যর্থতার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। অদক্ষতা এবং জনগণের অর্থের অপচয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক জবাবদিহির আওতায় আনা হোক—এটাই প্রত্যাশা।






