অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু মেলবোর্নের ফেডারেশন স্কয়ারে অবস্থিত ‘অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর দ্য মুভিং ইমেজ’ বা এসিএমআই। প্রতিষ্ঠানটি কেবল চলচ্চিত্র বা ভিডিও গেমসের সংগ্রহশালা হিসেবে নয়, বরং বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক আধুনিক শিক্ষালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রতিবছর দশ লক্ষাধিক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মুখর এই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি শিশুদের মানসিক বিকাশে ‘কিডস ফ্লিকস উইথ ফিলিংস’ নামক একটি বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিশুদের সহানুভূতি ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের পাঠ দেওয়া।

অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে এসিএমআই-এর জ্যেষ্ঠ কিউরেটর রিস গুডউইনের বরাতে এই উদ্যোগের বিস্তারিত উঠে আসে। রিস গুডউইন বলেন, “চলচ্চিত্রের মূল সার্থকতা নিহিত থাকে সহানুভূতির ভেতরে। যখন কোনো শিশু পর্দার চরিত্রের কষ্ট দেখে নিজের চোখে জল আনে, তখনই সে অন্যের দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার প্রথম পাঠটি পায়।” স্কুল ছুটির দিনগুলোতে আয়োজিত এই প্রদর্শনী শিশুদের ভয়, আনন্দ বা বিষাদের মতো জটিল আবেগগুলো চিনতে সাহায্য করছে। প্রতিটি প্রদর্শনী শেষে শিশুদের একটি করে ‘অ্যাকটিভিটি কিট’ দেওয়া হয়, যাতে তারা বাড়িতে গিয়েও সিনেমার বিষয়বস্তু নিয়ে চর্চা করতে পারে।

এসিএমআই-এর পর্দায় স্টিভেন স্পিলবার্গের ১৯৮২ সালের কালজয়ী সৃষ্টি ‘ইটি দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল’ থেকে শুরু করে আধুনিক ‘ইনসাইড আউট ২’, ‘কোকো’ কিংবা ‘ল্যাবিরিন্থ’-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে। এই সিনেমাগুলো শিশুদের দুশ্চিন্তা জয় করা, পূর্বপুরুষদের সম্মান জানানো এবং ভয়কে জয় করার সাহস জোগায়।

বিদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশুদের ক্ষেত্রেও এই মাধ্যমটি অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিডনি প্রবাসী মনোবিজ্ঞানী ও নাট্যকার জন মার্টিন এ প্রসঙ্গে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, “আমি দেখেছি, সিডনিতে আমাদের কমিউনিটির অনেক শিশু যখন ভালো মানের চলচ্চিত্র বা জীবনমুখী নাটক দেখে, তারা কেবল ভাষা শেখে না, বরং চরিত্রের হাসি-কান্নার মধ্য দিয়ে সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে শেখে। আমার নাটকে যখন কোনো কিশোর তার শেকড়ের গল্প বলে, তখন দর্শক সারিতে থাকা অন্য শিশুরা সেই আবেগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। এই একাত্মতা বা অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারাটাই হলো সামাজিক বিকাশের মূল চাবিকাঠি।”

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান সিডনি প্রবাসী অভিভাবক তানভীর আহমেদ। তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলের আচরণে পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার সাত বছরের ছেলে আগে খুব জেদ করত। কিন্তু ‘ইনসাইড আউট’ দেখার পর সে এখন তার রাগ বা মন খারাপের কারণগুলো বলতে পারে। সিনেমা এখন আমাদের বাসায় কেবল বিনোদন নয়, বরং বাবা-ছেলের কথোপকথনের একটা বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

গবেষকদের মতে, দৃশ্য ও শব্দের সমন্বয়ে তৈরি চলচ্চিত্রের আবহসংগীত ও সংলাপ শিশুদের মনে বই পড়ার চেয়েও দ্রুত প্রভাব ফেলে। ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লুইস প্যাচ মনে করেন, সিনেমা দেখার পর শিশুদের বিভিন্ন প্রশ্ন করা উচিত, যা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। বর্তমানের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিশুদের পর্দা থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা অসম্ভব। তাই ‘স্ক্রিন টাইম’ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে শিশুরা কী দেখছে এবং তা থেকে কী শিখছে, সেদিকে নজর দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছে এসিএমআই।