চরকি অ্যাওয়ার্ডসে ২ষ-এর জন্য সেরা নারী অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার জিতেছেন জয়া আহসান। গতকাল পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পেয়েছে জয়া অভিনীত সিনেমা ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’। নতুন সিনেমা ও সাম্প্রতিক পুরস্কার—এই দুই নিয়েই নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী।
সিনেমার গল্পে সম্পর্কের এক জটিল সমীকরণ। বিয়ের ১৭ বছর পর সুমন (কৌশিক সেন) ও শুভ্রা (চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়) তাদের সাংসারিক জীবনে ইতি টানেন। এরপর মধ্যজীবনের নতুন ইনিংস শুরু করতে চাইলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় সুমনের আকস্মিক অসুস্থতা। শপিং মলে সেরিব্রাল অ্যাটাকের পর রাতারাতি তার ঠিকানা বদলে হয় হাসপাতালের বিছানা। সুমন তখন বিবাহিত। তার স্ত্রী মেঘনা (জয়া আহসান) মুসলমান। ভবানীপুরের বনেদি বাড়ি থেকে বেরিয়ে তাদের নতুন সংসার গলফ গ্রিনের ভাড়াবাড়িতে গড়ে ওঠে। পরিস্থিতি মেঘনাকে টেনে নেয় একধরনের জালে—স্বামীকে টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত শুভ্রার কাছেই যেতে হয়। তবে এটি টাকার হিসাব মেটানোর প্রসঙ্গ নয়—স্বামীর ফেলে আসা সংসারের চাবিটি যার হাতে, স্বামীর সেই সাবেক স্ত্রীর কাছ থেকে হিসাব বুঝে নেওয়া ও স্বামীকে নতুন করে চিনে নেওয়ার চেষ্টা চলে মেঘনার। সুমন আবার কি ফিরে আসবে—এমন প্রশ্ন নিয়েই ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া কৌশিক গাঙ্গুলির ‘অর্ধাঙ্গিনী’ বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও পায়। তিন বছর পর এসেছে সিনেমাটির সিকুয়েল ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’; মেঘনা চরিত্রে ফিরেছেন জয়া আহসান।
কৌশিক গাঙ্গুলির সঙ্গে কাজ প্রসঙ্গে জয়া বলেন, ২০১৭ সালে ‘বিসর্জন’ দিয়ে প্রথম কৌশিক গাঙ্গুলির সঙ্গে কাজ করেন তিনি। এরপর করেছেন সেটির সিকুয়েল ‘বিজয়া’, তারপর ‘অর্ধাঙ্গিনীর’ দুই কিস্তি। ‘বিসর্জন’ ও ‘বিজয়া’র জন্য ফিল্মফেয়ার ইস্ট, জি সিনে অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন জয়া। কৌশিক কি অভিনেত্রী জয়াকে বেশি ভালোভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন—এর উত্তর তাঁর নিজেরও জানা নেই বলে জানান অভিনেত্রী। তিনি বলেন, ‘দেখুন, তাঁর সঙ্গে রসায়নটা কেন বারবার আমাদের সাফল্য পায় আমি ঠিক জানি না। হতে পারে তাঁর চিত্রনাট্য অথবা পরিচালনার গুণ, আমি ঠিক জানি না। তবে সম্পর্কের গল্প বলতে তাঁর জুড়ি নেই,’
‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’র মেঘনা চরিত্রটির নানা চড়াই-উতরাই প্রথম কিস্তিতেই দেখেছেন দর্শক। এবার মেঘনাকে আরও সাহসী হতে দেখা যাবে—এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন জয়া। তিনি বলেন, ‘মেঘনা চরিত্রটা তো আগে থেকেই তৈরি ছিল। তারপর সময় কিছুটা কেটে গেছে। শহরটা মেঘনার অনেকখানি হয়ে গেছে। ও পরিবারের একজন অংশ হয়ে গেছে। পরিবারে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বাচ্চাটা বড় হয়েছে। মেঘনার জীবনে নতুন নতুন আরও চরিত্র এসেছে। যেমন করে সিনেমাতে নতুন চরিত্রগুলো আসে। ও আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। কিন্তু সংসারে এবারও নানা রকমের টানাপোড়েন তৈরি হয়, অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়তে হয় মেঘনাকে। নতুন সিনেমায় সেটাই উঠে এসেছে।’
ঢাকা ও কলকাতা মিলিয়ে গত বছরটা দারুণ কাটিয়েছেন জয়া। ‘জয়া আর শারমিন’, ‘উৎসব’, ‘তাণ্ডব’, ‘ডিয়ার মা’ এবং ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’—পাঁচ সিনেমায় পাঁচ ধরনের বৈচিত্র্যময় চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে। কখনো করোনায় ঘরবন্দী অভিনেত্রী, কখনো ভূত, সাংবাদিক, আবার কখনো মায়ের ভূমিকায়; কখনো আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুসুম। তবে ‘উৎসব’-এর ভূতের চরিত্রটি ছাড়া বাকি চরিত্রগুলোকে জয়া মনে করেন তুলনামূলকভাবে জটিল মনস্তাত্ত্বিক। চলতি বছরের শুরুতে কলকাতায় মুক্তি পেয়েছে সৌকর্য ঘোষালের ‘ওসিডি’; সেখানে তিনি চিকিৎসকের ভূমিকায় অভিনয় করেন। আলাপচারিতায় জয়া জানান, জটিল চরিত্রে বিরতি দিয়ে একটু ‘হালকা’ মেজাজের চরিত্রে অভিনয় করতেও আগ্রহী তিনি। অভিনেত্রীর ভাষ্যে, ‘আমি তো অভিনয়শিল্পী; নানা ধরনের চরিত্র করতে চাই। একটু হালকা মেজাজের চরিত্রে আমিও অভিনয় করতে চাই। এ ধরনের কিছু চরিত্র নিয়ে কথা চলছে। বাকিটা তো নির্মাতাদের ওপর।’
জয়া আহসানের অভিনয় ধারাবাহিকভাবেই দর্শক-আলোচনায় থাকে। ৩ জুলাই চরকি অ্যাওয়ার্ডসে ২ষ-এর জন্য হয়েছে সেরা নারী অভিনয়শিল্পী। নুহাশ হুমায়ূনের ‘২ষ’-এর ‘বেসুরা’ পর্বে অভিনয়ের জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। তবে এ পুরস্কার নিয়ে আলাপের মধ্যে উঠে আসে পর্দায় ‘ডাইনি’ হয়ে ওঠার গল্প। একটি ছোট মেয়ে, যার গলায় সুর নেই—এমন পরিস্থিতিতে এলাকার বড় সংগীত সাধক ছোট মেয়েটিকে সাজা দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এরপর শোনা যায় বিশেষ কণ্ঠ। শেষে দেখা যায় বিশেষ কণ্ঠের সেই নারীকে। বেসুরার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী—এমন গল্পের পর্বটিতে শুরুতে জয়ার উপস্থিতির কথা বলেননি নির্মাতারা। মুক্তির পর অভিনয় দিয়ে চমকে দেন অভিনেত্রী। ডাইনি চরিত্রে অভিনয়ের কথা শুনেই কাজটিতে আগ্রহ বেড়েছিল বলে জানান জয়া আহসান। তিনি বলেন, ‘দর্শকেরা সবাই কমবেশি জানেন আমি ক্যারেক্টার আর্টিস্ট, ভিন্ন রকম চরিত্র করতে পছন্দ করি। গল্পটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নুহাশ হুমায়ূন ও গুলতেকিন খান মিলে ভীষণ শক্তিশালী গল্প লিখেছেন। ক্যামিও চরিত্র হিসেবে কাজটি করেছিলাম। ছোট চরিত্র হলেও এর প্রভাব অনেক বেশি। সেই চরিত্রের জন্য পুরস্কার পেয়ে ভালো লাগছে।’
নতুন নির্মাতাদের সঙ্গে কাজের ইচ্ছার কথাও জানান জয়া। তিনি বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব নির্মাতার সঙ্গেই কাজ করেছেন। এমনকি একেবারের আনকোরা পরিচালকের সঙ্গেও কাজ করতে দ্বিধা করেননি তিনি। ২০২১ সালে হাবিবুর রহমানের ‘অলাতচক্র’ মুক্তির সময় জয়া এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, নতুন নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি সব সময়ই মুখিয়ে থাকেন। পরে সিনেমা যেমনই হোক সেটি নিয়ে তাঁর আফসোসও থাকে না। তবে এবার নির্মাতাদের প্রসঙ্গ উঠতেই একটু চুপ থেকে জানালেন, তিনি প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষকে খুব মিস করেন। ‘সবচেয়ে বড় মিস করেছি আমি ঋতুদাকে। অনিক দত্তকেও খুব মিস করব। বাংলাদেশ বা কলকাতায় হোক নতুন নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। আশা করি, নতুন নির্মাতারা আমাকে ডাকবেন,’ বলেন তিনি।
আলাপের শেষে জয়া জানালেন, চলতি বছর একটু ‘ধীরে চলো’ নীতিতে চলছেন তিনি। গত বছর একসঙ্গে এতগুলো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, ঢাকা আর কলকাতা মিলিয়ে প্রচারে অংশ নেওয়াটাও কম ঝক্কির নয়। তবুও কিছু কাজ করেছেন, কিছু করছেন—আরও কয়েকটি প্রকল্পের কথা চলছে। তবে চূড়ান্ত হয়ে প্রযোজনা সংস্থা ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বলতে মানা।






