মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। বুধবার ভোরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলা অঞ্চলটির স্থিতিশীলতাকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে তেহরানের হামলার জেরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এই সামরিক সংঘাতের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—শুরু হওয়া শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে?
হামলার পর তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক কার্যত শেষ। যদিও তিনি আলোচনার পথ একেবারে রুদ্ধ করেননি, তবে তাঁর বক্তব্যে গভীর হতাশা ফুটে ওঠে। ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন।
এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপের শেয়ারবাজারে পতন এবং ডলারের দর বৃদ্ধিতে বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর জানাজা চলাকালেই আলোচনার প্রক্রিয়া এগোচ্ছিল। এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সম্মতির পর এটিই সবচেয়ে বড় আঘাত।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) পাল্টাহামলার দাবি করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে। ওই দেশগুলোতে সাইরেন বাজার খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকেও ড্রোন হামলায় তাদের একজন সদস্যের নিহতের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কমান্ড কাঠামো, রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রসহ ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। পাশাপাশি বিপ্লবী গার্ডের ৬০টির বেশি ছোট নৌযান ধ্বংসের দাবি করেছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, সৌদি আরব ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে ইরান দাবি করেছে, জাহাজগুলো তাদের নির্ধারিত নিরাপদ পথ ও মানচিত্র অমান্য করেছিল। তেহরানের বিশ্লেষকদের মতে, ওই অঞ্চলে মাইন অপসারণের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন সন্দেহে জাহাজগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর পুনরায় তেল নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। জুন মাসের সমঝোতা অনুযায়ী সাময়িকভাবে শিথিল হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের ফলে ইরানের প্রধান আয়ের উৎস তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি বড় ধাক্কার মুখে পড়ল।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে অভিহিত করেছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সমঝোতা স্মারকের গুরুতর লঙ্ঘন। তাঁর মতে, চাপ সৃষ্টি করে কিছুই অর্জন করা যাবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও জানিয়েছেন, এই হামলার ফলে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির মূল কাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে একে প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের মহাসচিব জাসেম আলবুদাইউই ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। কুয়েত, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর এই পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলাটি ছিল সীমিত পরিসরের, যা ইঙ্গিত দেয় তারা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না। তবে আগস্টের সময়সীমার আগে উভয় পক্ষই দর-কষাকষির জন্য সময় নিতে চাইছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামান্য ভুল পদক্ষেপও বড় সংঘাত ডেকে আনতে পারে, যদিও শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষ সমাধানের পথে ফিরবে কি না, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।






