ঘন মেঘে ছাওয়া আকাশের নিচে, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই অনেকেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন ‘ভুরভুরি জোড়া পুল’ এলাকায়। নানা বয়সের মানুষ সেখানে জড়ো হন। মেদেনীমহলের এই স্থানটি যেন খোলা হাওয়ায় বৈকালিক আড্ডাপিয়াসীদের জন্য এক ধরনের মিলন-তীর্থে পরিণত হয়েছে। ভুরভুরি জোড়া পুলের অবস্থান মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের মেদেনীমহল এলাকায়।

গত সোমবার বিকেলে রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়ক ধরে যেতে গিয়ে দেখা যায়, আকাশটা ঘনঘোর—মেঘ ডাকে। বেশ আগেই এমন আবহ ছিল। বর্ষাকালে যে কোনো সময় আকাশ ঢেকে মেঘ করতে পারে, বৃষ্টি নামতে পারে—তাই পথে বের হলে বৃষ্টির শঙ্কাও থাকে। রাজনগর উপজেলা সদর থেকে উত্তর দিকে যে সড়কটি গেছে, তা গ্রাম, হাওর পেরিয়ে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে বালাগঞ্জ খেয়াঘাটে গিয়ে থেমেছে। কুশিয়ারা নদীর ওপারে বালাগঞ্জ শহর। একটি পিচঢালা পথের দুই পাশে গ্রাম, খেত ও হাওরের জলরাশি। পথে পাঁচগাঁওয়ে পড়েছে নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগের পৈতৃক বাড়ি।

সড়কের দুপাশে কোথাও গা-লাগোয়া বাড়ি, কোথাও আলগা আলগা বসতি। বাকিটা খোলা মাঠ—কাউয়াদীঘি হাওরের অংশ। ভুরভুরি জোড়া পুল স্থানটি একদম হাওরের মাঝখানে, মেদেনীমহলে। রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কটি কাউয়াদীঘি হাওরের পূর্ব দিক দিয়ে হাওরের উত্তর-দক্ষিণ অংশকে সংযুক্ত করেছে। জোড়া পুলের (ব্রিজ) সব দিকেই খোলা হাওর, বহুদূর পর্যন্ত জলরাশির ঢেউ। এখান থেকে যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই দেখা যায় জলের বিস্তার। মাঝে মাঝে জলের ওপর ভেসে থাকে শাপলা-শালুক, শাপলা-শালুকের ফুল, কচুরিপানা আর সবুজ ঘাস। টলটলে জলে হাঁস ভেসে বেড়ায়। আকাশে চিলেরা উড়ছে। কেউ নৌকা নিয়ে জলের ওপর ভেসে মাছ ধরছেন, কেউ আবার গ্রামি সড়ক ডুবে যাওয়ায় নৌকা দিয়ে অন্যত্র যাতায়াত করছেন।

সড়কের মেদেনীমহল এলাকায় ভুরভুরি ছড়ার (খাল) ওপর আগে থেকেই একটি ব্রিজ (পুল) ছিল। ব্রিজটি বেশ উঁচু। হাওর এলাকায় হওয়ায় ব্রিজের নিচ দিয়ে নৌকা চলাচল করতে পারে—এ জন্যই এই উচ্চতা রাখা হয়েছিল। বর্ষায় গ্রামের মানুষ এই ব্রিজের নিচ দিয়ে হাওরে আসা-যাওয়া করেন। বৈশাখে হাওর থেকে বোরো ফসল নিয়ে গ্রামে ফিরতেও ব্রিজটি কাজে লাগে। পুরোনো হওয়ায় ও কিছুটা জরাজীর্ণ হয়ে গেলে সম্প্রতি পাশেই নতুন একটি ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। ভুরভুরি খালের ওপর পাশাপাশি দুটি ব্রিজ হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে জায়গার পরিচিতি ‘ভুরভুরি জোড়া পুল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

নতুন ব্রিজটি নিয়ে অবশ্য স্থানীয়দের মধ্যে কিছু আক্ষেপও রয়েছে। নতুন ব্রিজটি আগের ব্রিজ থেকে অনেক নিচু—সড়কের সমান করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে নতুন ব্রিজের নিচ দিয়ে এখন আর নৌকা চলাচল করতে পারে না। নৌকা চলাচল করতে না পারার এই অসুবিধাটির কিছুটা উপশমের দিকেই যেন নতুন করে দৃষ্টি গেছে মানুষের। এর আগে থেকেই বিকেলবেলা এখানে কয়েকজন ঘুরতে আসতেন—শীত হোক বা বর্ষা। এখন নতুন ব্রিজ নির্মাণ এবং সড়ক সংস্কারের ফলে স্থানটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। মাস কয়েক ধরেই ভিড় বাড়ছে ভুরভুরি জোড়া পুলে। বিকেল হলে আশপাশের গ্রামের মানুষ ছাড়াও অনেক দূরের মানুষও বেড়াতে আসছেন। খোলা হাওয়ার বাতাসের মধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ থাকায় জায়গাটি অনেকের কাছে মুক্ত নিশ্বাস নেওয়ার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।

মেদেনীমহল গ্রামের গেন্দু মিয়া বলেন, ‘বৈশাখ মাসে এই স্থানটিতে অনেক মানুষ থাকে। তখন ধান কাটা অয় (হয়)। এখানে ধান মাড়াই-ঝাড়াই অয়। বর্ষায় অনেকে মাছ মারইন (মারা হয়)। দুই মাস ধরি (ধরে) অনেক মানুষ আইরা (আসছেন)। আশপাশর মানুষ আইন (আসেন), দুরইর (দূরের) মানুষও আইন। ছুটির দিন খুব বেশি থাকইন (থাকেন)। মেঘ-বৃষ্টি আইলে কিছু কমি (কমে) যায়। সন্ধ্যার পর পর্যন্ত লোকজন থাকইন (থাকেন)।’

দূরদূরান্তের মানুষ আসা-যাওয়ার খবর স্থানীয়দের নজরও কেড়েছে। স্থানীয় তরুণ, প্রবাসীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্থানটিকে আরও মনোরম করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই মধ্যে ব্রিজের রেলিংসহ আশপাশের গাছের গোড়া রং করা হয়েছে। মানুষ বসার সুবিধার জন্য বেঞ্চও তৈরি করা হয়েছে। কৃষ্ণচূড়াগাছের চারা লাগানো হয়েছে।

গত সোমবার বিকেলে কয়েকজন তরুণকে রঙের পট হাতে দেখা গেছে। তাঁরা রঙের কাজ শেষ করেছেন মাত্র। শায়েক তালুকদার ও মো. রাজন নামের দুজন জানান, বৃষ্টি এলে পর্যটকেরা যাতে কোথাও দাঁড়াতে পারেন, ব্রিজ এলাকার সৌন্দর্য সংরক্ষণ করে এ রকম একটি ছাউনি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া আশপাশে হালকা খাবারের দোকানও হবে। বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ লাগানো হবে। প্লাস্টিক, বর্জ্য ফেলে স্থানটির পরিবেশ যাতে কলুষিত করা না হয়—এ জন্য ডাস্টবিনেরও ব্যবস্থা করা হবে।

মেঘলা আকাশ। শেষ বিকেলের আলোর তেমন দেখা মিলছে না। মেঘের ফাঁকফোকর গলে আসছে একটু-আধটু আলো—আর সেই আলোতেই হাওরের বুকে রঙের উপস্থিতি দেখা যায়। ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘন হচ্ছে। একঝাঁক হাঁস সারা দিন হাওরে ঘুরে খাবার খেয়ে ভাসতে ভাসতে বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে। তখনো হালকা বৃষ্টি ঝরছে। এই বৃষ্টিতেই ভিজেও অনেকে ঘুরছেন, আলাপ করছেন, আড্ডায় মেতে আছেন। ফেরার প্রস্তুতিও চলতে থাকে। ‘আঁধার নামিছে ধীরে বেলা গেল কোন দূরে’—হাওরের বুক থেকে শেষবেলার যতটুকু আলো ছিল, সেটাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। এবার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কমবেশি সবারই বাড়ি ফেরার পালা। আরও একবার রাত্রির নির্জনতায় ডুবতে থাকে ভুরভুরি জোড়া পুল।