দেশজুড়ে টানা তিন দিন ধরে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বুধবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামীকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত আট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি করেছে।

আষাঢ় মাসের শেষের এই টানা বৃষ্টির ফলে দেশের চার বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। তবে, তাদের মতে, এই বন্যা তিন দিনের বেশি স্থায়ী হবে না এবং আগামী শনিবার থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম জানান, "নিম্নচাপ এখন নেই। এর প্রভাব কিছুটা আছে বটে। এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে, তা বর্ষা মৌসুমের স্বাভাবিক বৃষ্টি।" তিনি আরও বলেন, "বায়ুতাপের তারতম্যের কারণে হাওয়া বইছে বেশি। বৃষ্টিও ঝরছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।"

দেশের বিভিন্ন স্থানে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ২০০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরাসহ উজান এলাকায়ও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আগামী চার দিন সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রামের আম বাগানে ২৭৭ মিলিমিটার। এছাড়া বান্দরবানে ২১০ মিলিমিটার, কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ২৩০ মিলিমিটার, ময়মনসিংহে ১৭৫ মিলিমিটার এবং মৌলভীবাজারে ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।

মুক্তকণ্ঠের ময়মনসিংহের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানি মাড়িয়ে চলাচল করছেন বাসিন্দারা। বস্তির অনেক ঘরে পানি উঠে গেছে। স্থানীয়রা জানান, "বৃষ্টি হলেই তাঁদের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পানি নেমে যেতে অন্তত এক দিন সময় লেগে যায়।"

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, শ্রীমঙ্গলে বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল সকাল থেকে বিকেল ছয়টা পর্যন্ত একটানা বৃষ্টি হয়েছে। জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষকে ভিজেই গন্তব্যে যেতে হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে গতকাল বিকেল ছয়টা পর্যন্ত ৩৬ ঘণ্টায় ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

শহরের কলেজ রোড এলাকার রিকশাচালক আবদুল কাদির বলেন, "সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে যাত্রী কম। সারা দিন ভিজে রিকশা চালাতে হচ্ছে। আয়ও অনেক কমে গেছে।"

গতকাল বেলা তিনটার দিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য দেশের সব বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কার কথাও জানানো হয়।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গতকাল মুক্তকণ্ঠকে জানান, "আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির কারণে উত্তর-পূর্ব, পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।"

তিনি আরও জানান, "সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।"

গতকাল সন্ধ্যায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানের সাঙ্গু নদ, কক্সবাজারের মাতামুহুরী নদী ও হবিগঞ্জে খোয়াই নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

সরদার উদয় রায়হান বলেন, "বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদীর পানিই বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।"