পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে নীলফামারী থেকে কুমিল্লায় এসে অটোরিকশা চালানো শুরু করেছিলেন মো. শরিফুল ইসলাম (৩৮)। কিন্তু ফুটবল খেলা দেখা নিয়ে তুচ্ছ বাগ্বিতণ্ডার জেরে প্রাণ হারাতে হলো তাকে। গত মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় এক চায়ের দোকানে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহত শরিফুল নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার উত্তর চেরাংগা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কুমিল্লা নগরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মঠপুষ্করনী এলাকায় সপরিবারে ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে মহসিন মিয়ার দোকানে বসে আর্জেন্টিনা ও মিসরের ম্যাচ দেখছিলেন শরিফুলসহ আরও অনেকে। খেলার শুরুতে লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করলে শরিফুল আর্জেন্টিনার এক সমর্থককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমার বাপে তো গোল দিতে পারল না’। মূলত এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় কয়েকজন তরুণের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা শরিফুলকে মারধর করেন। সেখান থেকে পাশের একটি মেসে আশ্রয় নিলেও হামলাকারীরা সেখানে গিয়েও তাকে পুনরায় মারধর করে। পরে দোকানের সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্বামীর মৃত্যুতে দুই মেয়েকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছেন স্ত্রী বিউটি বানু। বুধবার দুপুরে ভাড়া বাসায় আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, ‘খেলা নিয়া মানুষটারে এইভাবে মাইরা ফালাইবো, এইটা কেমন কথা? আমার দুইডা মাইয়া ছাওয়াল। এহন কারে বাবা কইয়া ডাকবো? আমার দুইডা মাইয়া এতিম হইয়া গেল। যারা আমার স্বামীরে খুন করছে, মুই তাদের কঠিন বিচার চাই। মুই গরিব-অসহায় মানুষ, এহন এই দুইডা মাইয়ারে কেমনে মানুষ করমু? হামার গোটা পরিবারডাই শেষ হইয়া গেল।’
নিহতের শ্বশুর মতিউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গতকাল রাতে আমাকে কল করে বলা হয়েছে, দ্রুত কুমিল্লা আসতে হবে জামাই অসুস্থ। আমরা ইমার্জেন্সি কুমিল্লা এলাম। এসে দেখলাম শরিফুলের লাশ। এটা কোন সমাজ আর কেমন দেশ? খেলার সময় কথা–কাটাকাটির জেরে একজন মানুষকে মেরে ফেলবে? আমার মেয়েটা এখন দুইটা কন্যাসন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচবে? আমরা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।’
পুলিশ জানায়, বুধবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে বিকেল পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ উপপরিদর্শক সংকর কান্তি দাস জানান, পরিবারের সদস্যরা বাদী ঠিক করে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। অভিযুক্তদের আটকের চেষ্টা চলছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা এলাকার উঠতি বয়সী তরুণ। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যে খেলা শেষে বাগ্বিতণ্ডা হয়। তখন শরিফুলের মাথায় কিল-ঘুষি মারা হয়। পরে শরিফুলকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরার চেষ্টা করছে।’
এদিকে ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তদের পরিবার অর্থ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চালাচ্ছে। ঘটনার পর থেকে চায়ের দোকানদার মহসিন মিয়া ও তার ছেলে আরিফুল ইসলামের ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।






