বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসের মাথায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের রদবদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিবর্তনের আওতায় নতুন পররাষ্ট্রসচিব নিয়োগের পাশাপাশি নিউইয়র্ক, দিল্লি, লন্ডন এবং জেনেভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি ও হাইকমিশনার পদে নতুন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক ও লন্ডনের নিয়োগগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার সরকারের একজন নীতিনির্ধারক মুক্তকণ্ঠের কাছে এই রদবদলের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে, "পররাষ্ট্রসচিব পদে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দীন নোমান চৌধুরীকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর বর্তমান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে দিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।"
পাশাপাশি, "বর্তমানে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। এই মুহূর্তে জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি নাহিদা সোবহানকে ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর হিসেবে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।"
যুক্তরাজ্যে গত মার্চ মাস থেকে হাইকমিশনারের পদটি শূন্য ছিল। সেখানে নিয়োগের বিষয়ে জানা গেছে, "গত মার্চ মাস থেকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের পদটি খালি আছে। লন্ডনে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সরকার ফরেন সার্ভিস একাডেমির বর্তমান রেক্টর ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুল মুহিতকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আভাস, "আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পরবর্তী অধিবেশনের আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব আইরিন খান নিউইয়র্কে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।"
এছাড়া, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ মিশনে উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান (এপেলো)।
এই রদবদল কবে কার্যকর হবে সে বিষয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি নিয়োগ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আইরিন খানের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বাকি নিয়োগগুলোর কার্যকারিতা নির্ধারণ করা হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মো. জসীম উদ্দিনকে পররাষ্ট্রসচিব নিয়োগ দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২০ জুন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম ২০ জুন পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তবে দায়িত্ব পালনের ৯ মাসের মাথায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জসীম উদ্দিনকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
অন্যান্য নিয়োগের ক্ষেত্রে, সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (আন্ত সরকারি সংস্থাসমূহ) এম ফরহাদুল ইসলামকে মরিশাসে পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যিনি জকি আহাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন। জকি আহাদকে ইতিমধ্যে ডেনমার্কে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার এখন পর্যন্ত তিনটি দেশে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়েছে। তারা হলেন আয়ারল্যান্ডে নুর-ই আলম, আর্জেন্টিনায় এ এফ এম জাহিদুল ইসলাম এবং পর্তুগালে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সাবেক পিএসও লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান। বর্তমানে সিঙ্গাপুর ও ইরান দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের পদ শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে, মার্চের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূতদের ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিল বিএনপি সরকার। সেই চারজনের মধ্যে এম মাহফুজুল হক, মো. ময়নুল ইসলাম ও এম মুশফিকুল ফজল (আনসারী) দেশে ফিরে এলেও মালদ্বীপের হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম ফেরেননি। এ বিষয়ে জানা গেছে, "অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ওই চার রাষ্ট্রদূতের মধ্যে তিনজন সরকারের আদেশ মেনে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম দেশে ফেরেননি। তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে এখনো কর্মস্থলে রয়ে গেছেন।"






