কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের হাওরে শিশুর লাশবাহী একটি নৌকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় নৌকায় থাকা যাত্রীদের তিনটি মুঠোফোন, নৌকার সোলার প্যানেলের ব্যাটারি ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে ডাকাতেরা। গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের চংনোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে হাওরাঞ্চলে চলাচল করা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের ঘমকপুর গ্রামের বাবু মিয়ার ১৫ দিন বয়সী কন্যাশিশু জন্মের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বিকেলে শিশুটি মারা যায়। পরে মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।

নৌকায় নিয়ে যাওয়া মৃত শিশুটির দাদা আবদুল হক জানান, করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ার প্রায় ১৫ মিনিট পর তাদের গতি রোধ করে একটি ছোট নৌকায় করে আসা ছয় সদস্যের ডাকাত দল। তিনি বলেন, যাত্রীবাহী নৌকার সদস্যরা অনেক আকুতি–মিনতি করে জানান, নৌকায় একটি শিশুর মরদেহ রয়েছে। কিন্তু ডাকাতেরা এসব না শুনে দেশীয় ধারাল অস্ত্র দেখিয়ে যাঁর কাছে যা ছিল, তা ছিনিয়ে নেয়। মারধরের ভয়ে যাত্রীরা তাঁদের সঙ্গে থাকা তিনটি মুঠোফোন ও কিছু নগদ টাকা ডাকাতদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।

নৌকার মাঝি রতন মিয়া বলেন, চংনোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় পৌঁছালে ডাকাতেরা নৌকায় উঠে সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ টাকা, মুঠোফোনসহ নৌকার সোলার প্যানেলের ব্যাটারি এবং সবার কাছ থেকে প্রায় চার হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সোহেব খান জানান, এ ঘটনায় এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নৌ পুলিশের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। চামড়াঘাট নৌ পুলিশের ইনচার্জ মো. ইস্কান্দার বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে গত ৭ জুন জেলার মিঠামইনের হাওরে আরেকটি যাত্রীবাহী নৌকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আন্তজেলা ডাকাত দলের তিন সদস্যকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৭ জুন সন্ধ্যায় মিঠামইন নৌঘাট থেকে করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাটের উদ্দেশে প্রায় ২০ থেকে ২২ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা রওনা হয়। যাত্রাপথে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে হাসানপুর সেতুর দক্ষিণ পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করে নৌকাটি। এরপর আবার যাত্রা শুরু করলে আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে ১০ থেকে ১২ জনের একটি ডাকাত দল এসে যাত্রীবাহী নৌকাটিতে ডাকাতি করে।

এক মাসের ব্যবধানে যাত্রীবাহী নৌকায় পরপর দুটি ডাকাতির ঘটনায় হাওরে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা হাওরাঞ্চলে নৌ পুলিশের টহল জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক আহমেদসহ কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, কয়েক বছর আগে হাওরাঞ্চলে ডাকাতির উৎপাত থাকলেও মাঝখানে বেশ কিছুদিন ডাকাতির কথা শোনা যায়নি। এখন এই বর্ষার শুরুতে আবারও ডাকাতদের আক্রমণে হাওরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ধ্যা হলেই হাওরাঞ্চলের নৌ-যাত্রীরা আশঙ্কায় থাকেন এবং অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটা আমরা শুনেছি। ডাকাতদের দ্রুত শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। এর আগের ঘটনায়ও আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে ডাকাতদের গ্রেপ্তার করেছিলাম। এবারের ঘটনাটিও গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। তবে যাত্রী ও নৌ–চালকদের প্রতি আমাদের পরামর্শ থাকবে সন্ধ্যার পরে যেন হাওরাঞ্চলে চলাচল না করে। ইতিমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে হাওরাঞ্চলের মুখ করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাট, নিকলী বেড়িবাঁধ ও ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কে তিনটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম করা হয়েছে। হাওরাঞ্চলে ডাকাতি প্রতিরোধে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে।’