এই হিসাব ২০২৫ সালের। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে ইশতেহারে।
.বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি।
অবশ্য বিদেশি বিনিয়োগ সব সময়ই কম পায় বাংলাদেশ। এমনকি তা আফ্রিকার দেশ উগান্ডা, ঘানা, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর মতো ছোট অর্থনীতির দেশের থেকেও কম।
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), অর্থাৎ অর্থনীতির আকার হচ্ছে ৫০১ বিলিয়ন (১ বিলিয়ন সমান ১০০ কোটি) ডলার। বাংলাদেশের তুলনায় উগান্ডার অর্থনীতির আকার সাত ভাগের এক ভাগ। দেশটি গত বছর ৩ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে।
একইভাবে ঘানা ও কঙ্গো অর্থনীতির আকারে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থেকে বেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে।
.আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার এই ছোট তিন দেশ জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদে বড় বড় প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ টানতে হিমশিম খাচ্ছে।.
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার (আঙ্কটাড) বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিবেদন ২০২৬-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ১ হাজার ৬২৪ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার এই ছোট তিন দেশ জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদে বড় বড় প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ টানতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশ ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ভালো বিনিয়োগ পাচ্ছে।
.জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম। এক বছরে এফডিআই প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও এর বেশির ভাগই পুনর্বিনিয়োগ। অনেক বহুজাতিক কোম্পানি নিজ দেশে অর্থ ফেরত পাঠাতে পারে না, কিংবা স্থানীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা মুনাফার অর্থ পুনর্বিনিয়োগ করে। কিন্তু তাতে সার্বিকভাবে নতুন খাতে বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান, নতুন দক্ষতা বাড়ে না।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত হবে। এ জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ ঠিক করা, অনুকূল নীতিমালা করা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সমস্যা কমিয়ে আনা, করকাঠামোর সমস্যা সমাধান করা জরুরি। এ ছাড়া ভূরাজনীতির কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।’
আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এফডিআই পাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচ দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন ও ব্রাজিল। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ২৭৭ বিলিয়ন, সিঙ্গাপুর ১৫১, হংকং ১১৬, চীন ১০৫ এবং ব্রাজিল ৭৭ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে।
.অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম। এক বছরে এফডিআই প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও এর বেশির ভাগই পুনর্বিনিয়োগ। অনেক বহুজাতিক কোম্পানি নিজ দেশে অর্থ ফেরত পাঠাতে পারে না, কিংবা স্থানীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা মুনাফার অর্থ পুনর্বিনিয়োগ করে।বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ
প্রবৃদ্ধি বেশি, বিনিয়োগ কম
২০১৫ সালে বাংলাদেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই আসে। তবে পরে তা কমে যায়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। কোনো বছরই এফডিআই ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যায়নি।
বিগত ছয় বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে সর্বনিম্ন ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই আসে। ওই বছরের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করেন। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ কমা স্বাভাবিক।
২০২৫ সালে বিনিয়োগ সাম্প্রতিক বছর পর্যায়ে গেছে। যেহেতু আগের বছর অস্বাভাবিক কম ছিল, সে কারণে গত বছর প্রবৃদ্ধি অনেক বেড়ে গেছে।
.আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এফডিআই পাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ পাঁচ দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন ও ব্রাজিল। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ২৭৭ বিলিয়ন, সিঙ্গাপুর ১৫১, হংকং ১১৬, চীন ১০৫ এবং ব্রাজিল ৭৭ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে।.
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যেসব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, তাদের মধ্যে ভারত গত বছর সবচেয়ে বেশি ৩৯ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া ২১, ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন, কম্বোডিয়া ৫ এবং পাকিস্তান ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে।
শুধু এফডিআই নয়, নতুন বিনিয়োগ বা গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের সংখ্যাও কমছে বাংলাদেশের। ২০২৪ সালে নতুন প্রকল্পের বিনিয়োগ ছিল ১৭৩ কোটি ডলার। গত বছর সেটি প্রায় ২৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১৩৩ কোটি ডলারে।
নতুন বিনিয়োগ আসা কমলেও বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ বাড়ছে। যদিও পরিমাণ এখনো খুবই কম। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ বিদেশে গেছে। গত বছর সেটি বেড়ে হয়েছে আড়াই কোটি ডলার।
.বিনিয়োগ বাড়ে না কেন
বাংলাদেশের চেয়ে এফডিআই প্রাপ্তিতে উগান্ডা, ঘানা ও ডি আর কঙ্গোর সাফল্যের পেছনে দেশগুলোর নীতি সংস্কার ভূমিকা রেখেছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘানার প্রেসিডেন্ট জন মাহামা গত বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসার খরচ হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙা করতে বেশ কিছু খাতে কর বাতিল করেন। উগান্ডা তাদের বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষকে ওয়ান স্টপ সেন্টারে (এক দরজায় সব সেবা) রূপান্তর করেছে। পাশাপাশি শিল্প পার্কগুলোতে বিশেষ সুবিধা দেয়। অন্যদিকে কঙ্গো অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাতের উদারীকরণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে বড় বিনিয়োগ টানছে।
এই তিন দেশ ছাড়াও আফ্রিকার মোজাম্বিকে গত বছর ৫ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন, নাইজেরিয়ায় ৪, ইথিওপিয়ায় ৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন এবং কেনিয়ায় ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এসেছে।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরের মাসেই সিঙ্গাপুরে বহুজাতিক দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) রিয়েল অ্যাসেট ফাইন্যান্স বিভাগের সহযোগী পরিচালক পদে কর্মরত আশিক চৌধুরীকে বিডার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। একই সঙ্গে তাঁকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যানও করা হয়।
.বিবিএক্সে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশে বলার মতো কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো এক বছরে আইনকানুনের তথ্য প্রাপ্তি, অবকাঠামোসুবিধা, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও মান—এই ছয় সূচকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।.
দায়িত্ব নেওয়ার পরের মাসে এক অনুষ্ঠানে আশিক চৌধুরী বলেছিলেন, উদ্যোক্তাদের সমস্যা বুঝতে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ২৩৫ জন প্রধান নির্বাহী ও কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। বিনিয়োগকারীরা বলেছেন যে তাঁরা নীতির ধারাবাহিকতা চান। সম্পদের প্রাপ্যতা নিয়েও সঠিক তথ্য জানতে চান। দুর্নীতির বিষয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সে সময় তিনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ব্যবসায়ের সব বাধা দূর করা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন করতে আগ্রহী।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ খুব একটা হয়নি। গত অক্টোবরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসা পরিবেশ সূচক বা ক্লাইমেট ইনডেক্সে (বিবিএক্স) প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশে বলার মতো কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো এক বছরে আইনকানুনের তথ্য প্রাপ্তি, অবকাঠামোসুবিধা, শ্রম নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ ও মান—এই ছয় সূচকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।
একাধিক ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম বেড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের সমাধান হয়নি। ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশ থেকে কমেনি। মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ঘরে। যদিও চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন খাতে শুল্ক ও করে ছাড় দিয়েছেন। ব্যবসা সহজ করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। আবার বন্ধ কারখানা চালু করতে বড় অঙ্কের প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে সরকার। শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ কতটা সফল হবে, সেটি সময়ই বলবে।
.বিদেশি বিনিয়োগে আমরা কোথায় পিছিয়ে আছি, সেগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সরকারের একমুখী চিন্তা থাকতে হবে। রাজস্বের চেয়ে কর্মসংস্থানে বেশি জোর দিতে হবে। তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।এফআইসিসিআই সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী
ইশতেহারে বিনিয়োগে জোর
বিএনপি সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা আছে, তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কোন জায়গায় বিনিয়োগ করলে বেশি মুনাফা করা যাবে, সেটিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেন বিনিয়োগকারীরা। তার বাইরে সহজে ব্যবসা করার বিষয়গুলো, যেমন নিবন্ধন, গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রাপ্তি, অবকাঠামো, বন্দরের সক্ষমতা, দুর্নীতি আছে কি নেই ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য দেয় তারা।
রূপালী হক চৌধুরী আরও বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগে আমরা কোথায় পিছিয়ে আছি, সেগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সরকারের একমুখী চিন্তা থাকতে হবে। রাজস্বের চেয়ে কর্মসংস্থানে বেশি জোর দিতে হবে। তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’






