ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের দীর্ঘদিনের বিরোধ আবার সামনে এসেছে। বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ সংকট মোকাবিলার চেষ্টার মাঝেই এ টানাপোড়েন আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওপেকের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে—জোটের ভেতরের সমন্বয় কতটা টেকসই থাকে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ওপেকের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৪০ ডলারে নেমে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ায় ওপেকের কয়েকটি সদস্যদেশ যুদ্ধকালীন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর দিকে যেতে চাইছে। এর ফলে উৎপাদন কোটা নিয়ে পুরোনো বিরোধ ফের জটিল আকার নিতে পারে। এ ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যেই ওপেকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাত গত এপ্রিল মাসে জোট ছেড়ে যায়।
এখন ওপেকের সামনে একাধিক বড় সিদ্ধান্তের চাপ। একদিকে উৎপাদন বাড়িয়ে জোট ধরে রাখার চেষ্টা এবং অন্যদিকে দাম তুলনামূলকভাবে বেশি রেখে লাভ ধরে রাখার হিসাব—দুটির মধ্যে ভারসাম্য নির্ধারণ জোটের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো এই জোট ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
এ বছরের বসন্তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেলের জন্য চাহিদার টান শুরু হলেও মধ্যপ্রাচ্যে তখন তেলের ঘাটতি ছিল না। মূল সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়—পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক ওপেকের সদস্যদেশগুলো ক্রেতাদের কাছে অপরিশোধিত তেল পৌঁছে দিতে পারছিল না। ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আটকে যায়।
ফলে ইরান, ইরাক, কুয়েতসহ কয়েকটি ওপেক সদস্যদেশ উৎপাদন কমিয়ে পরিস্থিতি বদলানোর অপেক্ষায় থাকে। এখন প্রণালিতে আবার জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় উৎপাদন কোটা নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিচ্ছে। ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক ইরাকও জোট ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির তেলমন্ত্রী ব্লুমবার্গকে বলেছেন, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ানো হলে ওপেকে থাকা না–থাকার বিষয়ে ইরাককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইরাকের তেল উৎপাদনে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেলের বেশি উৎপাদন করত তারা। এপ্রিল ও মে মাসে তা নেমে আসে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেলে—অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে যায়।
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরাক দৈনিক রেকর্ড ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের অনুমতি চাইছে। দীর্ঘ মেয়াদে তাদের লক্ষ্য হলো, উৎপাদন দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা।
এ বিষয়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্যাপিটাল অ্যাডভাইজরসের প্রধান নির্বাহী জে হ্যাটফিল্ড বলেন, তাদের সবেচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো অর্থ।
জোটের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, প্রভাব সবচেয়ে বড় হতে পারে সৌদি আরবের ওপর। ওপেকের সবচেয়ে বড় উৎপাদক ও জোটটির সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ তারা।
ইরাক বা কুয়েতের মতো সৌদি আরবের দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর তেমন প্রয়োজন নেই। কারণ, দেশটি পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাতে পারছে। ফলে সৌদি আরব লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ইরাক ও কুয়েতের সমুদ্রবন্দর কেবল পারস্য উপসাগরেই হওয়ায় তাদের সে সুযোগ ছিল না।
যুদ্ধ চলাকালে ইরাক ও কুয়েতের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমলেও সৌদি আরবের উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশের কম। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন বাড়ানোর চাপও তাদের সামনে তেমন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। বরং বৈশ্বিক চাহিদা পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের আগে উৎপাদন বাড়ালে তেলের দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, এ অবস্থায় বাজারে অতিরিক্ত তেল ছেড়ে দাম আরও কমিয়ে দেওয়া আত্মঘাতী হতে পারে।
ওপেকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ানো হবে। গত সপ্তাহান্তে ওপেক প্লাস, যেখানে রাশিয়াসহ কয়েকটি ওপেক–বহির্ভূত দেশও আছে, দৈনিক মাত্র ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্চের পর এটি পঞ্চম ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত।
ওপেক যদি সর্বোচ্চ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করে, তাহলে সেই অতিরিক্ত তেলের ক্রেতা নাও মিলতে পারে। কারণ, যুদ্ধের সময় তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং জ্বালানির সংকটের কারণে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যায়। এখনো সেই চাহিদা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বিশেষ করে চীন ও ইউরোপে দ্রুত বিদ্যুতায়নের কারণে চাহিদা যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় আর না–ও ফিরতে পারে।
জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা বলেন, ‘মাসের পর মাস আটকে থাকা তেল আবার বাজারে ফিরতে শুরু করলে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি হবে। কেননা, বাজার ইতিমধ্যেই সেই তেল ছাড়া চলতে শিখে গেছে।’
তাত্ত্বিকভাবে অবশ্য ক্রেতার অভাব না হওয়ার কথাও আছে। মার্চে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বে তেলের সরবরাহ প্রায় ১৪০ কোটি ব্যারেল কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক তেলের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ভবিষ্যতে এই মজুত আবার পূরণ করতে হবে।
তবে কানেভার মতে, সেটি সম্ভবত ২০২৬ নয়; বরং ২০২৭ সালের বিষয়। বিভিন্ন দেশের সরকার আগে দেখতে চাইবে তেলের দাম কোন দিকে যায়।
বাজারবিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার রপ্তানি শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ওপেক উৎপাদন বাড়ালে তা প্রায় ৯ কোটি ব্যারেল তেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়বে। সেই তেলের ক্রেতা যদি না থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ জলবায়ু ও পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ কিয়েরান টমকিন্স মনে করেন, আগামী বছর তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০ ডলারে নেমে আসতে পারে। ২০২৮ সালে তা ৫০ ডলারেও নামতে পারে।
ভোক্তাদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি ইতিবাচক হলেও ওপেকের বড় উৎপাদক দেশগুলোর ওপর তা চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও ওপেকের ঐক্যে ফাটল দেখা দিলেও এই জোট ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করা হয়। একসঙ্গে থাকলে দ্রুত পরিবর্তনশীল জ্বালানি বাজারে ও অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতাও মোকাবিলা করা যাবে।
তবে অতীতেও ওপেক এমন সংকট সামাল দিয়েছে। টমকিন্স বলেন, ইরাক এর আগেও বহুবার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, কিন্তু খুব বেশি সফল হয়নি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ওপেকের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
হরমুজ প্রণালির নজিরবিহীন অবরোধের কারণে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে। এতে সৌদি আরব নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, সৌদি আরব উৎপাদন এতটাই বাড়াতে পারে যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারের কাছাকাছি নেমে যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে এ পরিস্থিতি ধরে রাখার আর্থিক সক্ষমতা সৌদি আরবের আছে।
ম্যাককোয়ারি গ্রুপের বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস–বিষয়ক কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদী বলেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হয়তো বলতে পারেন, ‘তোমরা যদি খুব বেশি চাপ দাও, তাহলে আমরাও উৎপাদন বাড়াব। তখন দেখা যাবে, এত কম দামে কে কত দিন টিকে থাকতে পারে।’
যদিও দ্বিবেদীর মতে, এমন যে হবে, তার যেমন নিশ্চয়তা নেই, তেমনি বিষয়টি একেবারে অসম্ভবও নয়। তিনি আরও বলেন, ইরান যুদ্ধের সময় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। এখন যদি সেখান থেকে সবচেয়ে বড় অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়, সেটি হবে প্রকৃত অর্থেই নির্মম বিদ্রূপ।






