রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামে ভোরের আলো ফুটতেই কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়। শিশিরভেজা পানপাতায় হাত বুলিয়ে কৃষকেরা বরজে নামেন। সারি সারি পানবরজের সবুজ পাতার ফাঁকে শ্রমের ঘাম আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন মিলেমিশে থাকতে দেখা যায়।
গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে পানবরজের বিস্তার। যাঁরা একসময় শ্রমিকের কাজ করতেন, তাঁদেরও দেখা যায় বাড়ির সামনে পরিত্যক্ত জায়গায় পানের চাষ করতে। পান চাষের মাধ্যমে এলাকার অনেকের ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২৫ বছর আগেও মমিনপুর ইউনিয়নে ধান ও সবজির আবাদ হতো বেশি। পান চাষ যে লাভজনক, তা বুঝতে পারেন বলরামপুর গ্রামের কৃষক রবিনাশ রায় ও এমদাদুল হক। তাঁদের সাফল্য দেখে আগ্রহী হন আরও অনেকে। আগের বছরগুলোতে যাঁরা জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসলের চাষ করতেন, তাঁরা ধীরে ধীরে পানচাষে ঝুঁকে পড়েন।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, রংপুর সদর উপজেলায় ১৩৪ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। কৃষিজমি নেই, এমন অনেক পরিবারও বসতবাড়ির পাশে ও আঙিনায় পানের চাষ করছেন। লাভ বেশি হওয়ায় পানচাষ এখানকার মানুষের জীবিকার বড় অবলম্বন হয়ে উঠেছে।
গ্রামের পানচাষি এমদাদুল হক বলেন, ‘ধান কাটার পর আবার নতুন করে চাষের জন্য জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে নানা কাজ করতে হয়। এতে যেমন খরচ হয়, তেমন লাভ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে পান একবার চাষ করলে ১০-১২ বছর টানা বিক্রি করা যায়। এর মধ্যে শুধু খেত পরিচর্যার খরচ করতে হয়।’
গত শুক্রবার (২৬ জুন) গ্রামটি ঘুরে দেখা গেছে, মাঠজুড়ে পানবরজের দৃশ্য। কেউ খেত থেকে পান তুলছেন, কেউ করছেন পরিচর্যা। এ সময় কথা হয় গ্রামের পানচাষি মতিয়ার রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পান হামার কপাল খুলে দিছে। এখন গোয়ালে গরু আছে, ডুলিভরা ধান আর খেতভরা পান আছে। সব মিলে মোর সুখের সংসার।’
পানচাষের সুফল সরাসরি টের পাচ্ছেন—এমন বক্তব্যও মিলেছে কৃষক পরিবারের কাছ থেকে। গ্রামে ঢুকতেই মোমেনা খাতুনের বাড়ি দেখা যায়। তাঁর স্বামী সিরাজুল হক অসুস্থ এবং কাজ করতে পারেন না। আগে অন্যের বাড়িতে ও পানের বরজে ১৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করতেন মোমেনা। বাড়ির সামনে ১৮ শতক জমি ও আঙিনায় পান লাগিয়ে পাঁচ বছরের মাথায় সংসারে সচ্ছলতা আনেন। এখন পান বিক্রি ও গাভির পালনের আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। মোমেনা ১১ শতক জমি কিনেছেন এবং স্কুলপড়ুয়া তিন সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার।
বাড়ির সামনে লাগানো পানের বরজ দেখিয়ে মোমেনা বলেন, ‘বাহে পান নোয়ায় (নয়) এইগল্যা (এগুলো) যেন টাকার গাছ। পানোত কোনো লস নাই, তেমন খরচও নাই।’
গ্রামের আরেক পানচাষি আমিনুল হক পান চাষের খরচ ও লাভের একটি হিসাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ধানের চেয়ে পান চাষে লাভ বেশি। বছরে ৪০ শতক জমিতে দুবার ধান চাষ করে খরচ বাদে ১৬-১৮ হাজার টাকা আয় করা যায়। কিন্তু ৪০ শতক জমিতে পান চাষ করতে খরচ হয় এক লাখ টাকা। তিন মাস পরপর পান তোলা হয়। পান তোলার পর সেচ, সার ও বরজ মেরামত বাবদ ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বাজারে দাম থাকলে বছরে ওই ৪০ শতক জমির পান বিক্রি করে খরচ বাদে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। প্রতিটি পানগাছ থেকে ১০-১২ বছর পর্যন্ত পান পাওয়া যায়।
একই এলাকার কৃষক আফজাল হোসেন জানান, ‘এক বছর আগোত ৪০ শতক জমিত এক লাখ টাকা খরচ করি পানের গাছ নাগাছুন। চার মাস পর থাকি পান তুলি বেচাওছু। অ্যালা পান বেচে প্রত্যেক বছরে খরচ বাদে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় করুছুন।’
দেড় একর জমিতে পানের বরজ করেছেন গ্রামের লাল মিয়া। তিনি জানান, গত চার বছরে পান বিক্রি করে গড়ে তিনি আয় করেন চার লাখ টাকা। তাঁর ভাষ্য, ‘ধান চাষ আর আম চাষে লাভের পার্থক্য হচ্ছে আকাশ-পাতাল।’
২৫-৩০ বছর ধরে এ ইউনিয়নের অনেক কৃষক ধানের আবাদ কমিয়ে দিয়ে পানের চাষ করছেন বলে জানিয়েছেন মমিনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জিয়াউল হক। তিনি বলেন, এতে লাভ বেশি। ব্যবসায়ীরা গ্রামে ঘুরে কৃষকদের কাছ থেকে এসব পান কিনে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। দিন দিন বাড়ছে এলাকায় পানের চাষ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিন বিনতে আজিজা বলেন,পান অর্থকরী ফসল। এটি চাষ করা বেশ লাভজনক। এই ফসল চাষের জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।






