মধ্যপ্রাচ্যের বড় সংকটের মধ্যেও দেশে প্রবাসী আয় আসায় নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত ১২ মাসে প্রবাসীরা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন, যা স্বাধীনতার পর আর কখনোই আসেনি। প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেরও উন্নতি হয়েছে। এখন ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসী আয় ও রিজার্ভে স্বস্তি থাকলেও পণ্য রপ্তানিতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে পণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ। বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানি বেশি কমছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাজারেও চাহিদা কম। এ কারণে রপ্তানিমুখী কারখানা বন্ধের ঘটনাও ঘটছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় দুই উৎস—প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি নিয়ে স্বস্তি ও অস্বস্তিকে সঙ্গী করেই নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছর শুরু হয়েছে। তবে অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক গতিধারা ও পণ্য রপ্তানি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে।
.ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির সুযোগ বাড়বে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়লে পণ্য রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। যদিও ইইউতে পণ্য রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সমাধান না হলে শেষ পর্যন্ত সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাবে।
এদিকে পণ্য রপ্তানি কিছুটা কমলেও প্রবাসী আয়ে ভালো প্রবৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ বেড়েছে। গত বছরের ৩০ জুন মোট রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন। তার মধ্যে আইএমএফের হিসাবপদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী, রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। আর গত মাসে মোট রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ৩৬ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন। এ সময়ে বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন। অবশ্য রিজার্ভ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কম। এতে আমদানি সেভাবে বাড়েনি। যদিও ইরান যুদ্ধের কারণে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হয়েছে সরকার। তাতে রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে। তা না হলে রিজার্ভ আরও বেশি থাকত।
.প্রবাসী আয়ে রেকর্ড
দুই বছর আগে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হঠাৎ করে প্রবাসী আয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। তাতে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক মাধ্যমে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয় প্রায় ২৭ শতাংশ। ওই অর্থবছর প্রথমবারের মতো প্রবাসী আয় ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে নতুন রেকর্ড হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসেই ৩ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এতে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭ জুন পর্যন্ত ৩৫ দশমিক ২০ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫২০ কোটি) ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই আয় গত অর্থবছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রবাসী আয় বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হুন্ডিতে অর্থ আসা কমে যাওয়া। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হতো। এ ছাড়া বৈধ ও অবৈধ পথে ডলারের দামের পার্থক্য কমে এসেছে। পাশাপাশি বৈধ পথে আয় পাঠানো ও গ্রহণ সহজ হয়েছে। ফলে প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে। এই ধারা বহাল রাখতে নতুন বাজার খোঁজা ও দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।
.বৈধ ও অবৈধ পথে ডলারের দামের পার্থক্য কমে এসেছে। পাশাপাশি বৈধ পথে আয় পাঠানো ও গ্রহণ সহজ হয়েছে। ফলে প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে। এই ধারা বহাল রাখতে নতুন বাজার খোঁজা ও দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।মোস্তফা কে মুজেরী, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক
পণ্য রপ্তানি কমছে
সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই–মে) ৪ হাজার ৩৮০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আড়াই শতাংশ কম। তার আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৪ হাজার ৪৯৫ কোটি ডলারের পণ্য।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত জুলাইয়ে ৪৭৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তারপর জানুয়ারি, এপ্রিল ও মে মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। বাকি মাসগুলোয় এই পরিমাণ কমে যায়। এসব মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
.রপ্তানিকারকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। এতে তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ধাক্কা খায়। শুধু তা–ই নয়, ইউরোপের বাজারেও তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। ইরান যুদ্ধ শুরু হলে সংকট আরও প্রকট হয়। ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে গেছে। তার প্রভাবে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা বাড়ছে।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘বিশ্ববাজারে একধরনের মন্দাভাব রয়েছে। সেখানে আমাদের করণীয় সীমিত। তবে চীন ইইউর বাজারে যেভাবে আগ্রাসী বিপণন করছে, আমাদেরও তেমন করতে হবে। তা না হলে আমাদের বাজার হারানোর প্রবণতা বাড়বে। আগ্রাসী বিপণনের জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকারের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিযোগিতাসক্ষমতা ও পণ্যবৈচিত্র্য আনতে উদ্যোক্তাদের চেষ্টা বাড়াতে হবে। এ জন্য সরকারকেও সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে।






