কক্সবাজারের সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে আবারও প্রায় ৮০০ অবৈধ দোকান গড়ে উঠেছে। উচ্ছেদ অভিযানের পরও দখলদারদের ফিরে আসায় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির কারণে দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে না।

.

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত মানেই অবারিত নীল জলরাশি আর দিগন্তবিস্তৃত বালিয়াড়ি। তবে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতের খুব অল্প এলাকায় পর্যটকদের ভিড় থাকে। বিশেষ করে সুগন্ধা পয়েন্টের মাত্র এক কিলোমিটারে পর্যটকদের সমাগম হয় সবচেয়ে বেশি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই সৈকতে মানুষের ঠাসাঠাসি ভিড় থাকে। বিপুল এই জনসমাগমকে কেন্দ্র করে সুগন্ধা এলাকায় ভাসমান হকারদেরও ভিড় দেখা যায়। ভাজা মাছ, চা-কফি, ফল, শামুক-ঝিনুকের গয়না থেকে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে সৈকতে থাকা পর্যটকদের কাছে যান ভাসমান হকাররা। পাশাপাশি সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে তৈরি পোশাক, আচার, চকলেট, শুঁটকিসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রায় ৮০০ দোকান গড়ে তোলা হয়েছে সেখানে। বারবার এসব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হলেও আবারও গড়ে উঠছে।

পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) এভাবে সৈকত দখলে উদ্বিগ্ন পরিবেশকর্মীরা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, কক্সবাজার ভ্রমণে এসে শুঁটকি, আচার, চকলেট, ঝিনুকের গয়নাসহ নানা সামগ্রী কেনেন পর্যটকেরা। পর্যটকদের কেনাকাটার এই প্রবণতার কারণেই সেখানে বিভিন্ন পণ্যের জমজমাট কেনাবেচা চলে। এ কারণেই অবৈধ দোকান বসানো হয়। কোটি টাকার এই বাণিজ্যের সঙ্গে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের একশ্রেণির দুর্নীতিবকাজ কর্মকর্তার স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকায় সৈকত দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

.
সুগন্ধায় অবৈধভাবে বসানো দোকানপাটে শামুক-ঝিনুকের পণ্য, ফাস্ট ফুড ও সি-ফুড কম দামে পাওয়া যায়। সৈকতে ঘোরাঘুরির সময় কেনাকাটা ও খাবারের সহজলভ্যতা পর্যটকদের সেসব দোকানে যেতে উৎসাহিত করে। তবে ভাসমান ব্যবসায়ী ও হকারদের কারণে সুগন্ধা সৈকত দিন দিন ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হচ্ছে। দখলদারির ফলে নিরিবিলি পরিবেশে সাগর দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পর্যটকেরা। ক্ষতি হচ্ছে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যেরও।
.

হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক, পর্যটক, ট্যুর অপারেটর, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সুগন্ধায় সৈকত দখলের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে।

সুগন্ধা সৈকত শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা ও হোটেল-মোটেল জোনের কাছাকাছি অবস্থিত। যাতায়াত সহজ হওয়ায় পর্যটকেরা প্রথমেই সুগন্ধায় আসেন। তা ছাড়া হোটেল থেকে হাঁটাপথেই পৌঁছানো যায় এই সৈকতে। ফলে বয়স্ক, শিশুসহ সব বয়সী পর্যটকদের জন্য সুগন্ধা পছন্দের শীর্ষে। এসব পর্যটকের একটা বড় অংশ সুগন্ধা সৈকতের বিভিন্ন দোকান থেকে কেনাকাটা করেন। ফলে ব্যবসায়ীরা সেখানেই ভিড় করেন।

সুগন্ধায় অবৈধভাবে বসানো দোকানপাটে শামুক-ঝিনুকের পণ্য, ফাস্ট ফুড ও সি-ফুড কম দামে পাওয়া যায়। সৈকতে ঘোরাঘুরির সময় কেনাকাটা ও খাবারের সহজলভ্যতা পর্যটকদের সেসব দোকানে যেতে উৎসাহিত করে। তবে ভাসমান ব্যবসায়ী ও হকারদের কারণে সুগন্ধা সৈকত দিন দিন ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হচ্ছে। দখলদারির ফলে নিরিবিলি পরিবেশে সাগর দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পর্যটকেরা। ক্ষতি হচ্ছে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যেরও।

.

কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, শহর ও হোটেল-মোটেল জোনের খুব কাছে হওয়ায় সুগন্ধা পর্যটকদের পছন্দের এলাকা। এ ছাড়া নেখানে লাইফগার্ডসহ নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই পর্যটকেরাও এই সৈকতকে নিরাপদ মনে করেন। শত কিলোমিটার বিস্তৃত সৈকতের আরও কিছু স্থানে লাইফগার্ড মোতায়েন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলে সুগন্ধায় ভিড় কমত। ফলে ভাসমান ব্যবসায়ীরাও সেখান থেকে সরতেন। কিন্তু প্রশাসনের অদূরদর্শিতায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত অরক্ষিত থেকে গেছে। এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছে দখলদার সিন্ডিকেট।

.
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ। বালিয়াড়িতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু কেউ আইন মানছে না।
.

দীর্ঘ দুই দশক ধরে সুগন্ধা সৈকত থেকে বারবার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং বারবার সেখানে অবৈধ দখলদারেরা দোকানপাট বসাচ্ছেন। উচ্ছেদ ও দখল নিয়ে এভাবে চলছে ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলা। এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করার জন্য উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু একটি উচ্ছেদ অভিযানের ধুলাবালু না সরতেই আবারও একই ধরনের অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে।

পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, অবৈধ দোকানগুলোর দৈনিক আয় অনেক বেশি। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা সিন্ডিকেটও। এ কারণে উচ্ছেদের পর আবারও দোকানপাট বসানো হয় নানা কৌশলে।

.

গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৯৩০টি দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই নির্দেশনা অমান্য করে গত ঈদুল আজহার ছুটির কয়েক দিনে সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে আবার চার শতাধিক দোকান বসানো হয়। বর্তমানে এর সংখ্যা আট শতাধিক। গভীর রাত পর্যন্ত এসব দোকানে ভাজা মাছ, রকমারি খাবার, শামুক-ঝিনুক পণ্য, কাপড়চোপড়, আচার, প্রসাধন সামগ্রী, পান-সিগারেট, চা-কফি বেচাবিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ দোকানের নিচে চারটি করে চাকা লাগানো। উচ্ছেদ অভিযানে নামলে যেন দ্রুত দোকান সরিয়ে ফেলা যায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ। বালিয়াড়িতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু কেউ আইন মানছে না।

.

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘সেভ দা কক্সবাজার’ শাখার সভাপতি তৌহিদ বেলাল বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর সুযোগ দিয়ে লোকজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সৈকতে নামার প্রবেশমুখে এসব ঝুপড়ি দোকানপাট পর্যটকদের দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ বলেন, তিন দশক ধরে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টের বালিয়াড়ি দখল করে হাজারো দোকানপাট নির্মাণ করে কোটি টাকার বাণিজ্য করা হচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলে দোকানপাটের মালিকানাও পরিবর্তন হয়। উচ্ছেদও হয়। কিন্তু আবার সৈকত দখল করে দোকান গড়ে ওঠে।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে সুগন্ধাসহ কয়েকটি পয়েন্ট থেকে ৯ শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিলাম। উচ্ছেদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও ছিল। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত (উচ্ছেদ হওয়া) ব্যক্তিরা উচ্চ আদালতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রিট করেন। আদালত থেকে তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা পেলে অবৈধ স্থাপনাসমূহ আবার উচ্ছেদ করা হবে।’

.কক্সবাজার সৈকত দখল করে ফের চার শতাধিক দোকান নির্মাণ.

গত রোববার বিকেলে সুগন্ধা সৈকতে গিয়ে দেখা গেছে, বৈরী আবহাওয়ায়ও সৈকতে প্রচুর পর্যটকের উপস্থিতি। তবে ভ্রাম্যমাণ হকারদের কারণে অনেক পর্যটক বিরক্ত হচ্ছিলেন। সৈকতজুড়ে দোকান বসানোয় সেখানেও কেনাকাটা করতে হাজির হয়েছেন প্রচুর মানুষ। ঢাকার রামপুরা থেকে আসা পর্যটক আল এহসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা থেকে সমুদ্রের বিশালতা দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখি মেলার মতো অবস্থা। সবখানেই দোকান আর দোকান।’

কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, প্রতিবছর কক্সবাজারে ঘুরতে আসেন ৭০-৮০ লাখ পর্যটক। বেশির ভাগ পর্যটক একবারের জন্য হলেও সৈকতে নামেন। বেশির ভাগ পর্যটক সুগন্ধা সৈকতে নামার সময় বালিয়াড়িতে ঝুপড়ি দোকান দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সেখানে নানা অপরাধও ঘটে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত ১২ মার্চ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর সৈকতে মুক্ত পরিবেশ ফিরে এসেছিল। এখন উচ্ছেদ হওয়া বালিয়াড়ি দখল করে ফের দোকান নির্মাণ করায় পুরোনো চেহারা ফিরে এসেছে।