কর্মকর্তারা বলছেন, অভিভাবকেরা চান না সন্তানেরা বিদ্যালয়ে যাক। অভিভাবকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, বিদ্যালয়ে ক্লাস হয় না।

.

রাজশাহী নগরের শিরোইল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শীর্ষ রোল নম্বরধারী এক শিক্ষার্থী চলতি বছরে শুধু এক দিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়েছে। দশম শ্রেণির দুটি শাখার মধ্যে একটিতে মোট শিক্ষার্থী ৫৩ জন। তাদের উপস্থিতি যাচাই করার জন্য দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে গত ১ এপ্রিলের উপস্থিতি দেখা হয়। ওই দিন মাত্র পাঁচ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। নগরের ছয়টি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওই এক দিনের হাজিরা যাচাই করে একই ধরনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিক্ষকেরা বলছেন, সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত সন্তোষজনক উপস্থিতি পাওয়া যায়, এর পর থেকে কমতে থাকে।

শিক্ষকেরা বলছেন, নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যে আদব-কায়দা শেখে, তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তারা শুধু মুখস্থ বিদ্যা নিয়ে ভালো ফলাফল করে আত্মকেন্দ্রিক স্বভাবের হচ্ছে। কোনো সামাজিকতা শিখছে না। শিক্ষকদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাভক্তি নেই। মা-বাবার সঙ্গেও তারা ভালো আচরণ করতে পারছে না। বিদ্যালয় চলাকালে কোচিং বন্ধ না হলে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।

.

রাজশাহী নগরের শিরোইল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা. জাকিয়া পারভীন বলেন, শিক্ষার্থীদের তাঁরা একাধিকবার নোটিশ দিয়েছেন, তাগিদ দিয়েছেন; কিন্তু তারা আসে না। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ক্লাস চলে। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘক্ষণ স্কুলে থাকতে চায় না।

এ সংকট মোকাবিলায় রাজশাহীতে শিক্ষা সুরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যসচিব গোলাম মোস্তফা বলেন, কয়েক মাস আগে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বিদ্যালয় চলাকালে কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখতে হবে। কোচিংয়ের আসনসংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। ফি একবারে না নিয়ে মাসে মাসে নিতে হবে। সভায় বিভাগীয় কমিশনারও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত কেউ মানেনি। এবার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে (শিক্ষা ও আইসিটি) প্রধান করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোচিং সেন্টারগুলো তো বন্ধ করা যাবে না। একটু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সরকারি প্রমথনাথ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় রাজশাহী শহরের একটি নামকরা বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ‘ক’ শাখায় ১ এপ্রিল ৫৮ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন উপস্থিত ছিল। এই শাখার শীর্ষ রোল নম্বরধারী এক শিক্ষার্থী এ বছরে মোট ৯ দিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়েছে। তার মা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভালোই ক্লাস করেছে। দশম শ্রেণিতে উঠেই সামনে পরীক্ষা, ভ্যাকেশনও ছিল, সে জন্য বাড়িতে বসে প্রস্তুতি নিচ্ছে।’ তাহলে কি শিক্ষকের প্রয়োজন নেই—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নেওয়া হচ্ছে।’ তারপরও বিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা বলছি না। আমার মেয়ের একটু টনসিলের সমস্যা, এ কারণেই ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারেনি।’

.

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি যে স্কুলে না আসার জন্য বিভিন্ন কারণের মধ্যে কোচিং সেন্টার একটি। কোচিং সেন্টারের শিক্ষকেরা মায়েদের বোঝান, স্কুলে গেলে তিন-চার ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। বাচ্চারা ক্লান্ত হয়ে আসে। বেশি পড়ার সুযোগ পায় না। কোচিংয়ে অল্প সময় থাকতে হয়। তারপর বাড়িতে পড়াশোনার বেশি সময় পায়।’ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ২০১০ সালের পর থেকে এই প্রবণতা বাড়তে শুরু করেছে। নিয়ম অনুযায়ী ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি না থাকলে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয় না। আর এটা করতে গেলে প্রধান শিক্ষকেরা রাজনৈতিক চাপের শিকার হন। ফলে ধীরে ধীরে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এবার অন্তত ৫০ শতাংশ উপস্থিতি না থাকলে পরীক্ষার ফি নেওয়া হবে না ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর কিছু অভিভাবক স্কুলে এসে উচ্চবাচ্য করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে দশম শ্রেণির বি শাখায় মোট শিক্ষার্থী ৫৫ জন। ১ এপ্রিল উপস্থিত ছিল ৯ জন। শীর্ষ রোল নম্বরধারী এক শিক্ষার্থী এ বছরে মাত্র তিন দিন ক্লাস করেছে।

.

রাজশাহী লোকনাথ উচ্চবিদ্যালয়ে কোনো পরীক্ষার কেন্দ্র হয় না। এই বিদ্যালয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, তাদের উপস্থিতির হারও একই ধরনের। প্রধান শিক্ষক মোছা. ফিরোজা বেগম বলেন, অভিভাবকদের ডেকে কথা বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘ছেলেটার শরীর ভালো থাকে না, মাথাব্যথা করে।’ প্রধান শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, অনেক বাচ্চাই রাত জেগে মুঠোফোন ব্যবহার করে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে না। এ জন্য বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। উপস্থিতির ধারাবাহিকতা থাকে না। পরের ক্লাসটা বুঝতে পারে না। ফলে বিদ্যালয়ে আসতে তার আর ভালো লাগে না।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা রাজশাহী অঞ্চলের উপপরিচালক আবদুর রশিদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অনেক শিক্ষক ক্লাসের উপস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা সবাই বলেছেন স্কুল টাইমে কোচিং সেন্টার বন্ধ করতে পারলে এ অবস্থা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে। পরীক্ষার পরে এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে একটা বৈঠক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।