আষাঢ়ের মেঘ ও বৃষ্টির লুকোচুরির মধ্য দিয়েই শুরু হলো জুলাই। বাংলাদেশে এই সময়ে আকাশ সাধারণত মেঘলা থাকলেও বর্ষার মেঘের ফাঁকে ফাঁকে যখনই আকাশ পরিষ্কার হবে, তখনই এক চমৎকার মহাজাগতিক ক্যানভাস উঁকি দেবে। ১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা তথা বাংলাদেশের আকাশপ্রেমীদের জন্য বেশ কিছু আকর্ষণীয় দৃশ্য অপেক্ষা করছে।
সন্ধ্যার আকাশে শুক্রের একক আধিপত্য
জুলাইয়ের প্রথমার্ধে সন্ধ্যার আকাশে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে থাকবে শুক্র গ্রহ। সূর্যাস্তের পর পশ্চিম–উত্তরপশ্চিম দিগন্তে তাকালে খালি চোখেই সবচেয়ে উজ্জ্বল বিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করতে দেখা যাবে এই সন্ধ্যাতারাকে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে শুক্র আকাশজুড়ে আরও উঁচুতে অবস্থান করবে, যার ফলে সূর্যাস্তের পর প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একে পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে। গত মাসে আমরা শুক্র ও বৃহস্পতির যে দারুণ যুগলবন্দী দেখেছি, এই মাসে তা আর থাকছে না। বৃহস্পতি এখন সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে যাওয়ায় সন্ধ্যার আলোয় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তাই সন্ধ্যার পশ্চিম আকাশে শুক্র এখন একক রাজত্ব করবে।
.ভোরের আকাশে শনি, মঙ্গল ও বুধের মেলা
যাঁরা শেষ রাতে বা ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন, তাঁদের জন্য জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিন পূর্ব ও দক্ষিণ–পূর্ব আকাশজুড়ে থাকবে গ্রহদের চমৎকার বিন্যাস। জুলাইয়ের প্রথমার্ধে মধ্যরাতের পরপরই (রাত ১১টার পর) দক্ষিণ–পূর্ব দিগন্তে উদিত হবে বলয়ধারী গ্রহ শনি। ভোর চারটার দিকে এটি আকাশের বেশ উঁচুতে অবস্থান করবে। টেলিস্কোপ দিয়ে শনির বলয় দেখার জন্য এটি চমৎকার সময়। আর শনি উদিত হওয়ার ঘণ্টাখানেক পর পূর্ব দিগন্তে দেখা মিলবে লাল গ্রহ মঙ্গলের। সূর্যোদয়ের আগে পূর্ব আকাশে এর লালচে আভা খালি চোখেই স্পষ্ট চেনা যাবে।
জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে ১০ জুলাইয়ের পর থেকে বুধ গ্রহ ভোরের আকাশে যোগ দেবে। সূর্যোদয়ের ঠিক ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট আগে উত্তর–পূর্ব দিগন্তের একদম নিচে বুধকে একটি ছোট উজ্জ্বল বিন্দুর মতো দেখা যেতে পারে, তবে এটি দেখার জন্য দিগন্ত সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকা চাই।
.চাঁদ ও গ্রহের সংযোগ
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের শেষ রাতে চাঁদ সৌরজগতের এই গ্রহগুলোর খুব কাছ দিয়ে তার মাসিক পরিক্রমা সম্পন্ন করবে। ৪ জুলাই মধ্যরাতের পর ও ৫ জুলাই ভোরে ক্ষীয়মাণ চাঁদকে শনি গ্রহের খুব কাছাকাছি অবস্থানে দেখা যাবে। ৭ জুলাই ভোরে পূর্ব আকাশে বাঁকা চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহ একে অপরের অত্যন্ত কাছে অবস্থান করবে, যা খালি চোখে দেখার জন্য একটি দারুণ দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য তৈরি করবে।
আষাঢ়ে পূর্ণিমা
১০ জুলাই বাংলাদেশের আকাশে দেখা যাবে জুলাইয়ের পূর্ণ চাঁদ। উত্তর গোলার্ধের আদিবাসীদের ঐতিহ্য অনুযায়ী এই পূর্ণিমাকে ‘বাক মুন’ বলা হয়। কারণ, এই সময়ে পুরুষ হরিণের মাথায় নতুন শিং গজাতে শুরু করে। আষাঢ়ের মেঘের আড়াল থেকে যখন এই পূর্ণ চাঁদ বেরিয়ে আসবে, তখন মেঘ ও জোছনার আলোছায়ার খেলা গ্রামবাংলা ও শহরের আকাশকে এক অপার্থিব রূপ দেবে।
.মাথার ওপর সামার ট্রায়াঙ্গেল
জুলাইয়ের রাতে মেঘ কেটে গেলে মাথার ঠিক ওপরে এবং উত্তর–পূর্ব আকাশজুড়ে বিখ্যাত সামার ট্রায়াঙ্গেল বা গ্রীষ্মকালীন ত্রিভুজটি তার পূর্ণ রূপ নিয়ে হাজির হবে। ভেগা, ডেনেব ও আলটায়ার নামের তিনটি উজ্জ্বল নক্ষত্র মিলে তৈরি এই ত্রিভুজ ঢাকার আলোকদূষণপূর্ণ আকাশ থেকেও খুব সহজে চেনা যায়। এ ছাড়া উত্তর আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল এখন বেশ উঁচুতে অবস্থান করছে, যার সাহায্যে ধ্রুবতারাকে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে।
পর্যবেক্ষকদের জন্য টিপস
আষাঢ়ের অবিরাম বৃষ্টির মধ্যেও মাঝেমধ্যে আকাশ হুট করে পরিষ্কার হয়ে যায়। ভারী বৃষ্টির ঠিক পরপরই বাতাসের সব ধূলিকণা ধুয়ে যাওয়ার কারণে আকাশ বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বচ্ছ থাকে। গ্রহ–নক্ষত্র দেখার জন্য এই সংক্ষিপ্ত সময়টুকুই সেরা সুযোগ। শুক্র ও মঙ্গল যেহেতু দিগন্তের কাছাকাছি থাকবে, তাই এগুলো দেখার জন্য বড় কোনো খোলা মাঠ বা বহুতল ভবনের ছাদ বেছে নেওয়া ভালো।
.জুলাইয়ের এই প্রথমার্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির মেঘের আড়ালেও মহাবিশ্বের গ্রহ–নক্ষত্রেরা তাদের নিজস্ব নিয়মে মেতে উঠেছে রূপের প্রদর্শনীতে। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে মেঘমুক্ত কোনো এক রাতে আকাশের দিকে তাকালে আপনিও হারিয়ে যেতে পারেন এই অনন্ত মহাবিশ্বে।
সূত্র: স্কাইম্যাপ, টাইম অ্যান্ড ডেট, স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ, অ্যাস্ট্রোনমি ডটকম, সাইটেক






