রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৯ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৫ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে। এ বাজেটে নগরবাসীর ওপর কোনো নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান কর বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়নি। অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা, ডিজিটাল সেবা ও সবুজায়নকে বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে নগর ভবনের সিটি হল কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান (রিটন) এ বাজেট ঘোষণা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক বলেন, নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়েই বাস্তবসম্মত আয়-ব্যয়ের সমন্বয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। নাগরিকসেবার মানোন্নয়ন এবং উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখাই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য।
রাসিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৮০৬ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩৪ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। নতুন অর্থবছরের বাজেট তার চেয়ে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা বেশি।
প্রশাসক জানান, বাজেটে সিটি হাসপাতালের আধুনিকায়ন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি চারটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনসহ জনবহুল স্থানে বিশুদ্ধ পানি, আধুনিক শৌচাগার ও নামাজের স্থান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য প্রবেশমূল্যে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসক বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হোল্ডিং ট্যাক্সে ৯০ শতাংশ ছাড় বহাল থাকবে। আগামী ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, দোকানভাড়া এবং বিভিন্ন লাইসেন্স ফিতে ১৫ শতাংশ সারচার্জ মওকুফ করা হবে। ছাদবাগানকে উৎসাহিত করতে হোল্ডিং ট্যাক্সে ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে।
বাজেটে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন প্রকল্পের কথা জানানো হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য থেকে সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহানগরীর সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ড্রেন থেকে কাদামাটি অপসারণ, নতুন ফগিং মেশিন কেনা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
প্রশাসক জানান, নগরের হড়গ্রাম, বিলসিমলা ও বন্ধগেট রেলক্রসিংয়ে নির্মাণাধীন তিনটি ফ্লাইওভার চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া নগরজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন, নাগরিক তথ্যসেবাকেন্দ্র চালু এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে নগরীর ১৫৫টি স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পদ্মাপাড় এলাকায় গার্ডেন লাইট বসানো, গুলজারবাগ, ভদ্রা লেক ও সোনাদিঘিতে আধুনিক ফোয়ারা নির্মাণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় পদ্মার চরে পাখির অভয়ারণ্য, নতুন সিটি গেট, আধুনিক কসাইখানা, ইনডোর স্টেডিয়াম ও নতুন বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে বিশেষায়িত ২ হাজার শয্যার হাসপাতাল, বায়োডাইভারসিটি পার্ক, আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টার, নতুন শহর গড়ে তোলা এবং পদ্মা নদীকেন্দ্রিক পর্যটন উন্নয়ন।
রাসিকের সব কার্যক্রম ধাপে ধাপে অটোমেশনের আওতায় আনা, অনলাইন ও ই-পেমেন্ট চালু, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার এবং ১৬১০৫ নম্বরে হেল্পলাইন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নগর ভবনে ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিদেশি ভাষা শেখানোর প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জাপানসহ বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান প্রশাসক।
আগামী এক বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রায় ৫৩ হাজার চারা রোপণ শুরু হয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, বৃত্তি, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও কিরাত প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনাও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এফ এ এম আঞ্জুমান আরা বেগম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ই-সাঈদসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।






