২০১১ সালের ৩০ জুন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল। তা বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশে নির্বাচনের গতিপথ, রাজনীতিতে রাখে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা। বিশ্লেষকেরা বলেন, সেই পদক্ষেপ রাজনীতিতে যে সংকট তৈরি করেছিল, তার ধারাবাহিক পরিণতিতে আসে জুলাই অভ্যুত্থান, যাতে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ।

.

২০১১ সালের ৩০ জুন, বেলা ১০টা ৫০ মিনিট। জাতীয় সংসদের সভাকক্ষ তুমুল করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। এর ঠিক আগেই আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলের সংসদ সদস্যদের ভোটে সংবিধান থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে। তাকে স্বাগত জানিয়েছিল সেই করতালি।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগের সেই পদক্ষেপ বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশে নির্বাচনের গতিপথ। এই ভোটের মাধ্যমে ফিরে আসে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের যুগ, যা দেশের রাজনীতিতে পরবর্তী দেড় দশকের সংকটের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পরের ইতিহাস সবারই জানা। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী পদে রেখে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দেশে তিনটি নির্বাচন হয়, যার সব কটিই ছিল বিতর্কিত। অথচ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, এই দাবি তুলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলনেই তিন দশক আগে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয়েছিল সংবিধানে।

.

পরপর দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে হওয়ার পর ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি কে এম হাসানকে নিয়ে আপত্তি তোলে আওয়ামী লীগ। যুক্তি দেখানো হয়, তিনি একসময় বিএনপিতে যুক্ত ছিলেন। এরপর টানা হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতার পর দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়, ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর নির্বাচনে ক্ষমতায় যায় আওয়ামী লীগ।

.
এরপর ১৯৯৬ সালে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। এরপর ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচন, ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন এবং ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন এ ব্যবস্থার অধীনে হয়েছিল, যেগুলো গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল দেশে-বিদেশে।
.

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পর সংসদের তৎকালীন স্পিকার (পরে রাষ্ট্রপতি) মো. আবদুল হামিদ সেদিন সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, এর আগে সংবিধান সংশোধনের সব বিল রাতে পাস হয়েছিল। এবারই প্রথম প্রকাশ্যে দিনের বেলায় সংবিধান সংশোধন হলো।

সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। বিলটি পাস হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১টায়।

দেড় দশক পর দিনের আলোয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আনন্দ প্রকাশ করা হলেও দেশের রাজনীতির আকাশে সেদিনই এক কালো মেঘ দানা বেঁধে ওঠে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিরোধিতা করে বিএনপিসহ বিরোধী জোট আগেই রাজপথে নেমেছিল। এই আন্দোলন, সংকট ও অচলাবস্থা চলেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত।

.

তার আগে বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। তাঁর সেই শাসনকাল একনায়কতান্ত্রিক সরকারের তকমা পায়। আর তার প্রতিক্রিয়ায়ই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন ভারতে।

.
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দেশে যে তিনটি সাধারণ নির্বাচন হয়, এর সব কটিই ছিল বিতর্কিত।
.

এরপর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি।

বাংলাদেশের বিভাজন ও অসহনশীল রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা ভালো সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এর প্রথম নজির ১৯৯০–এর গণ–আন্দোলনে এইচ এম এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচন প্রশংসিত হয় সব মহলে।

এরপর ১৯৯৬ সালে নির্বাচনকালীন এই সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক স্বীকৃতির পর ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচন, ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন এবং ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল দেশে-বিদেশে।

.

আদালতের এক রায়ের প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর তখনই রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধিতা উঠেছিল। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। এতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও পক্ষভুক্ত হয়।

.

সেই রিট আবেদনের রায়ে গত বছরের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের আদেশ দেন। তবে তা কার্যকর করার কথা বলা হয় চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এখন সংসদে এ–সংক্রান্ত সংবিধানের সংশোধনী পাস করতে হবে। বর্তমান সংসদে সরকারি দল বিএনপি, প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী সব রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহালের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।

.

বাতিল হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখা না–রাখা নিয়ে যখন উচ্চ আদালতে মামলা চলছিল, তখন আইনজ্ঞরা এ ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। তবে কেউ কেউ এ ব্যবস্থার সংস্কার চেয়েছিলেন। এমনকি আওয়ামী লীগের করা সংসদীয় কমিটি যখন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে, তখন ব্যবস্থাটি বহাল রাখার পক্ষে মতই পেয়েছিল।

.
এ বি এম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি থাকাকালে ২০১১ সালের ১ মার্চ শুরু হয়ে মাত্র ১০ কার্যদিবসে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানি শেষ করা হয়। তিনি অবসরে যাওয়ার আট দিন আগে ওই বছরের ১০ মে আপিল বিভাগ রায় দেন। তাতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
.

সংসদীয় কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল না করে সংস্কারের ওপরই জোর দিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কমিটির বৈঠকের পর সবকিছু পাল্টে যায়। এরপর কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ করে। পরে সংসদে ভোটাভুটিতে তা বাতিল হয়ে যায়।

সে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন, আওয়ামী লীগের এমন একাধিক নেতার সঙ্গে তখন কথা বলে জানা গিয়েছিল, আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এনেছিল, সেই আওয়ামী লীগ ব্যবস্থাটি বাতিল করবে, এটা তাদের ভাবনাতেই আসেনি। কিন্তু ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলা এবং এক-এগারোর সময় কারাগারে যাওয়া—সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা যেকোনো মূল্যে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। সে জন্য সংবিধানের যত সংশোধন দরকার, সবই করার প্রতিজ্ঞা ছিল তাঁর। পরে তিনি তা করেছেনও।

.

তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের প্রতিটি নির্বাচনে সর্বশেষ ক্ষমতায় থাকা দলটি হেরে যায়। সরকার গঠন করেছে বিরোধী দলে থাকা শক্তি। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার উপায় হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পথে হাঁটেন শেখ হাসিনা, এমনটাই মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় পার্টি মিলে মহাজোট হয়েছিল। সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ মহাজোটের সংসদ সদস্য ছিলেন ৩০৪ জন।

.
সংবিধান সংশোধনে ২০১০ সালের ২১ জুলাই জাতীয় সংসদের তৎকালীন উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিএনপি ও জামায়াত অংশ নেয়নি। ফলে কমিটির সব সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলের সংসদ সদস্যরা।
.

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিলটি পাসের সময় ২৯১ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সবাই বাতিলের পক্ষে ভোট দেন। বিএনপি ও জামায়াতের সদস্যরা সংসদ বর্জন করেছিলেন।

এ প্রক্রিয়া নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার তাঁর ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন, যেভাবে একতরফাভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়, তাকে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কতন্ত্র’ বলা যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠের এ ধরনের মতামত চাপিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে কোনোমতেই সংগতিপূর্ণ নয়। আর এর পরিণতিও শুভ হয় না। এর মাধ্যমে সমঝোতার পরিবর্তে সংঘাতের রাজনীতিরই প্রসার ঘটে।

.

আদালতের কাঁধে বন্দুক

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করতে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন হয়েছিল। আইনটির শিরোনাম ছিল সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন।

এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৯ সালে একটি রিট আবেদন হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন যে ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকবে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল হয়। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। তখন এবং এক-এগারোর সরকারের সময় বিষয়টি আর এগোয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর আপিল মঞ্জুর করে শুনানি শুরু হয়।

.
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন হয়েছিল। তা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৯ সালে একটি রিট আবেদন হয়েছিল। হাইকোর্ট ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন যে ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকবে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে আপিল হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর আপিল মঞ্জুর করে শুনানি শুরু হয়।
.

এ বি এম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি থাকাকালে ২০১১ সালের ১ মার্চ শুরু হয়ে মাত্র ১০ কার্যদিবসে গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানি শেষ করা হয়। তিনি অবসরে যাওয়ার আট দিন আগে ওই বছরের ১০ মে আপিল বিভাগ রায় দেন। তাতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

.

সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেওয়া সেই রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ চাইলে আরও দুটি নির্বাচন (দশম ও একাদশ) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

.
২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে বিলটি পাস হয়। আওয়ামী লীগ, তাদের মহাজোট সঙ্গী জাতীয় পার্টিসহ ২৯১ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে ভোট দেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ফজলুল আজিম বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত সংসদ বর্জন করেছিল।
.

এজলাসে দেওয়া সংক্ষিপ্ত সেই রায়ের ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর যখন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়, তাতে পরবর্তী দুই নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকার বিষয়টি ছিল না। এমনকি সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও সংসদ বহাল থাকার কথাও যুক্ত হয় পূর্ণাঙ্গ রায়ে। সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায়ের এই অসংগতি নিয়ে তখনই জোরালো বিতর্ক উঠেছিল।

আপিল বিভাগের রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণায় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি এস কে সিনহা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এতে ভিন্নমত পোষণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। বিচারপতি মো. ইমান আলী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে মত না দিয়ে বিষয়টি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মত দেন।

.

রায়ের আগে আদালত ১০ অ্যামিকাস কিউরির মত নেন। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী টি এইচ খান (প্রয়াত), ড. কামাল হোসেন, আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম (প্রয়াত) ও রোকনউদ্দিন মাহমুদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। প্রয়াত রফিক-উল হক ও এম জহির এ ব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। আরেকজন অ্যামিকাস কিউরি আজমালুল হোসেন কিউসি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আওয়ামী লীগ সরকারের গঠনের পর দীর্ঘদিন শুনানির অপেক্ষায় থাকা একটি রাজনৈতিক বিষয় সামনে আনা এবং দ্রুত রায় দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধিই মুখ্য ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে রায় দেওয়া বিচারপতিদের সবাই পরে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। এ বি এম খায়রুল হক অবসরের পর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তিনি এখন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

বদিউল আলম মজুমদারের বইটির মুখবন্ধে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন লিখেছেন, রাজনৈতিক বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত, ক্ষমতাসীনদের দ্বারা আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা, বিশেষ সংসদীয় কমিটির সুপারিশে পরিবর্তন, গণভোট না করা, সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায়ের অসংগতি, সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে সংশোধনের অযোগ্য ঘোষণা ইত্যাদি কারণে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে অনেক প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

.

লোকদেখানো বিশেষ কমিটি

২০১০ সালের ২১ জুলাই জাতীয় সংসদের তৎকালীন উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিতে বিএনপি ও জামায়াত অংশ নেয়নি। ফলে কমিটির সব সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর মিত্র দলের সংসদ সদস্যরা। কমিটির কার্যপরিধি ছিল—সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের মতামত গ্রহণ ও আলোচনা করা।

এই কমিটি ২০১০ সালের ২৯ জুলাই থেকে ২০১১ সালের ২৮ মে পর্যন্ত মোট ২৬টি বৈঠক করে এবং ২০১১ সালের ৮ জুন ৫১ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন সংসদে জমা দেয়।

.
সংসদীয় বিশেষ কমিটি ২০১০ সালের ২৯ জুলাই থেকে ২০১১ সালের ২৮ মে পর্যন্ত মোট ২৬টি বৈঠক করে এবং ২০১১ সালের ৮ জুন ৫১ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন সংসদে জমা দেয়। তার আগে খসড়া সুপারিশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিনে সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব ছিল। তবে শেখ হাসিনা ওই খসড়ায় সম্মতি দেননি।
.

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কমিটি প্রথমবার আলোচনা করে ২০১১ সালের ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্দশ বৈঠকে। ওই বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা দূর করে কীভাবে এটি সংস্কার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সংবিধানবিরোধী ও বাতিল ঘোষণা করে সংক্ষিপ্ত রায় দেওয়ার পর ১৬ মে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। এর মধ্যে একটি খসড়াও তৈরি করা হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিনে সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব ছিল।

.

এরপর ৩০ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে বিশেষ কমিটি। ওই খসড়ায় শেখ হাসিনা সম্মতি দেননি। এরপর বিশেষ কমিটি আর কোনো বৈঠক করেনি। ২০১১ সালের ৮ জুন বিশেষ কমিটি সংসদে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে ৫১ দফা সুপারিশের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিষয়টি ছিল।

.

এরপর ২৫ জুন তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ সেই সুপারিশ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করেন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দ্রুত বিলটি পরীক্ষা করে ২৯ জুন প্রতিবেদন দেয়। বিএনপিসহ বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে ৩০ জুন সংসদে বিলটি পাস হয়। আওয়ামী লীগ, তাদের মহাজোট সঙ্গী জাতীয় পার্টিসহ ২৯১ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে ভোট দেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ফজলুল আজিম বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত সংসদ বর্জন করেছিল।

.

তখনো সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি।

বিশেষ কমিটি সাবেক প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি, আইনজ্ঞ, সংবিধানবিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছিল। আলোচনায় প্রায় সবার বক্তব্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংস্কারের পরামর্শ আসে। বাতিলের পক্ষে খুব একটা মত পাওয়া যায়নি। সব পরামর্শই শেখ হাসিনার মতের কাছে হার মানে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পরিণতি নিয়ে বদিউল আলম মজুমদার তাঁর বইয়ে লেখেন, এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার জোটসঙ্গীরা সমঝোতার রাজনীতির পথ থেকে সরে আসে এবং দলীয় সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতিতে ফিরে যায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল রাজনৈতিক অবিশ্বাসের একটি সাংবিধানিক সমাধান। ১৯৯৬ সালে এর জন্ম হয়েছিল রাজনৈতিক সংঘাত থেকে, আবার ২০১১ সালে এর বিলুপ্তিও হয়েছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। উচ্চ আদালতের রায়গুলো বিভিন্ন সময়ে এ ব্যবস্থার বৈধতা, সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে মাত্র।