প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন সফর নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ চীন সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নয়; বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে। পাশাপাশি একটি বিদেশ সফর কখনোই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়। অনেক সময় সেটিই একটি দেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরকে মূল্যায়ন করতে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। বাংলাদেশ কী অর্জন করল; চীন কী পেল এবং এই সফর কি বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে আরও শক্তিশালী করল?
১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একাধিক চীন সফরও এই সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। ফলে তারেক রহমানের বেইজিং সফর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ধারাবাহিকতারই অংশ।
.চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক: উদীয়মান প্রাচ্যের জোয়ারে নতুন যাত্রা.এ সফরের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৭টি সমঝোতা স্মারক। কিন্তু কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই দেশের প্রকাশিত যৌথ ঘোষণা। কারণ, সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকতে পারে, কিন্তু যৌথ ঘোষণা দুই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্কের দিকনির্দেশনা তুলে ধরে।
যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশ ও চীন তাদের বিদ্যমান কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো–অপারেটিভ পার্টনারশিপ আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে অভিন্ন ভবিষ্যৎ গঠনের লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। চীনের কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের পরিভাষা শুধু সৌজন্যসূচক নয়; এগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত সহযোগিতার প্রতিফলন।
এ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ। দক্ষিণ এশিয়ায় খুব অল্প কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের এমন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এটি স্পষ্ট যে সম্পর্ক কেবল বাণিজ্য ও উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, আনোয়ারা ও চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ইনভেস্ট বাংলাদেশ সম্মেলনে প্রায় ৮০টি শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণও বাংলাদেশের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
.তাৎক্ষণিকভাবে এ সফর হয়তো কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনেনি। তবে এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত ও কৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার কত দ্রুত বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয়।.
তবে এখানেই বাস্তবতার প্রশ্ন আসে। বিদেশি বিনিয়োগ শুধু ঘোষণার মাধ্যমে আসে না। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল নীতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, দক্ষ বন্দর, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, আইনি নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছ করব্যবস্থা প্রত্যাশা করেন। সরকার ঘোষিত ১৮০ দিনের সংস্কার কর্মসূচি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এ সফরের অর্থনৈতিক সাফল্য।
বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বা এক পথ এক অঞ্চল উদ্যোগ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার পর কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক, সেতু, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ডিজিটাল অবকাঠামোসহ নানা ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা এসেছে। তবে চীনের এ উদ্যোগেও পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়; শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, কৃষি এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে গুরুত্ব বাড়ছে। যৌথ ঘোষণায় ‘উচ্চমানের বিআরআই সহযোগিতা’র উল্লেখ সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
ব্রিকসে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়েও চীনের ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি ব্রিফিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্রিকসে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং চীন এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছে। যদিও ব্রিকসে সদস্যপদ এককভাবে কোনো একটি দেশের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না, তবু চীনের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি। ভবিষ্যতে এই জোটে যুক্ত হতে পারলে উন্নয়ন অর্থায়ন, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার হতে পারে।
.প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর থেকে যা চেয়েছি, যা পেয়েছি.একই সঙ্গে সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সঙ্গেও ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ এখনো এই জোটের সদস্য নয়, তবে সংলাপ অংশীদার বা পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হলে মধ্য ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হতে পারে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার সংযোগের সম্ভাবনা। অনেকে এটিকে পুরোনো বিসিআইএম ইকোনমিক করিডরের পুনরুজ্জীবন হিসেবে দেখছেন। ভারতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা–উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কারণে বিসিআইএম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে এই নতুন সম্ভাবনার পথও সহজ নয়। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, রাখাইন অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এ উদ্যোগের সামনে বড় বাধা হয়ে থাকবে। তাই এটিকে এখনই বাস্তব প্রকল্পের চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা উচিত।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। চীন যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, কারিগরি সহায়তা এবং প্রকল্প পরিকল্পনায় সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু পূর্ণ অর্থায়ন বা নির্মাণের প্রতিশ্রুতি এখনো দেয়নি। ফলে এটিকে সম্ভাবনার পর্যায়ে মূল্যায়ন করাই বাস্তবসম্মত।
.রোহিঙ্গা সংকটেও চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপ সহজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব অগ্রগতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হলে এ সহযোগিতার প্রকৃত মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে না।
এ সফরের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পুনঃপ্রতিফলন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ অন্য অংশীদারদের গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিবাজার, জাপান দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী এবং ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
তারেক রহমানের চীন সফরকে কোনোভাবেই ব্যর্থ বলা যাবে না। আবার এটিকে যুগান্তকারী সাফল্য বলাও সময়ের আগে হবে। এ সফরের প্রকৃত গুরুত্ব সমঝোতা স্মারকগুলোতে নয়; বরং যৌথ ঘোষণার রাজনৈতিক ভাষা, কৌশলগত আস্থা, ব্রিকসে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অগ্রযাত্রায় চীনের ইতিবাচক অবস্থান, বিআরআই সহযোগিতার নতুন ধারা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরিতে।
.কূটনীতিতে ঘোষণা কেবল শুরু। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবায়নের ওপর। আগামী কয়েক বছরে চীনা বিনিয়োগ কতটা বাড়ে, শিল্পাঞ্চল কতটা গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান কত সৃষ্টি হয়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কত দূর এগোয়, ব্রিকস ও সম্ভাব্য এসসিওর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা কতটা অগ্রসর হয় এবং একই সঙ্গে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যায়—এসবই নির্ধারণ করবে এ সফরের প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
তাৎক্ষণিকভাবে এ সফর হয়তো কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনেনি। তবে এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত ও কৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এই রাজনৈতিক অঙ্গীকার কত দ্রুত বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয়।
ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
মতামত লেখকের নিজস্ব






