দেশের খ্যাতিমান শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন চিত্রশিল্পী বা পাপেটশিল্পের পথিকৃৎই নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। শিশুদের জন্য তাঁর কাজ, শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এই গুণী মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল কথাসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের। আজ সোমবার মৃত্যুর খবর শোনার পর স্মৃতিচারণায় এই গুণী ব্যক্তির নানা দিক তুলে ধরেছেন ফরিদুর রেজা সাগর
.

গত এক বছরে মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। প্রতিবারই দেখা হওয়ার সময় আমি মনে মনে ভেবেছি, স্যারের সঙ্গে আর দেখা হবে কি না। কিন্তু স্যার দৃঢ়প্রত্যয়ে, খুব কড়া জোর নিয়ে বলেছিলেন, ‘সাগর, আবার দেখা হবে। তোমাদের এখানে এসে খুব ভালো লাগে। এই আড্ডাটা, তোমরা সবাই যে আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলো, গল্প করো—এটা আমার এখনো খুবই ভালো লাগে।’

.

মুস্তাফা মনোয়ারের বক্তৃতা অনেক শুনেছি। ছোটবেলা থেকে তাঁর কথা শুনছি। আজকে আমাদের যে রুচিবোধ বা কোনো কিছু ভালো—এই জ্ঞানটুকু যাঁদের মাধ্যমে হয়েছে, তার মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার অবশ্যই প্রথম দিককার একজন। তিনি সব সময় শিখিয়েছেন, কী করে মানুষের মনজয় করার মতো ভালো কিছু করতে হবে। আর টেলিভিশনের পর্দা নিয়ে যে কাজ করা যায়, মানুষের মনকে জয় করা যায়, তার তো ছিলেন তিনি জাদুকর।

.

আমার এখনো মনে আছে, মুস্তাফা মনোয়ারকে আমি প্রথম যখন টেলিভিশনের পর্দায় দেখি, তিনি শেখাচ্ছিলেন কাগজ কেটে কী করে খেলনার মতো জিনিস তৈরি করা যায় এবং সেটা দিয়ে কেমন মজার মজার খেলনা তৈরি করা যায়।

.

মুস্তাফা মনোয়ারের ‘কাটুম কুটুম’ কিংবা ‘ফেলনা জিনিস খেলনা নয়’—এই রকম নামে প্রথম দিকে টেলিভিশনে ছোটদের বহু অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন এবং সেই অনুষ্ঠানগুলো আমরা দুই চোখ বড় বড় করে দেখতাম, শিখতাম। টেলিভিশনের একেবারে প্রথম যুগ থেকে রঙিন টেলিভিশন পর্যন্ত; টেলিভিশনের পর্দায় কীভাবে জাদু দেখাতে হয়, কীভাবে পরিবর্তন আনতে হয়, তার এক বিশাল বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি।
মুস্তাফা মনোয়ার ডিআইটির স্টুডিওতে, সেই ছোট্ট স্টুডিওতে বসে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর মতো নাটক যে করা যায়, শেক্‌সপিয়ারের নাটকের নাট্যরূপ দিয়ে বা ছায়া অবলম্বনে, সেটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। পুরো স্টুডিওতে সেট ফেলে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর নাটক, আমি জানি না এখনো টেলিভিশনের আর্কাইভে রয়েছে কি না। কারণ, সে সময় তো ধারণ করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

.

শুধু নাটক করা নয়, ছোটদের অসংখ্য জিনিস, ছোটদের ভালো লাগে, এমন জিনিস নিয়ে মুস্তাফা মনোয়ারের ধ্যানধারণা ছিল। আমি একবার, আমি, আলী ইমাম—আমরা সবাই মিলে একবার ওয়াল্ট ডিজনির জন্মদিন এক বছরে দুবার উদ্‌যাপন করে ফেলেছিলাম। ভুলটা স্বীকার করে পরবর্তী সময় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে, খালেদা আপা ছিলেন, তাঁকে বলেছিলাম যে আপা ভুল হয়ে গেছে।

কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, ‘শোনো, ওয়াল্ট ডিজনির জন্মদিন যদি ভুলে কেউ দুবারও পালন করে, সেটা একদিক দিয়ে ভালো।’ আমি বলেছিলাম, স্যার, কেন? তিনি বললেন, ‘ছোটরা ওয়াল্ট ডিজনি সম্পর্কে আরও জানতে পারবে। মিকি মাউস সম্পর্কে ছোটদের জানা খুব প্রয়োজন। জন্মদিন না হলেও মিকি মাউস নিয়ে, ছোটদের প্রিয় চরিত্র নিয়ে কাজ করো। ছোটদের কখনো ছোট মনে করবে না। তারাই কিন্তু একদিন এই দেশ চালাবে, তারাই একদিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হবে।’

.

মুস্তাফা মনোয়ারের টেলিভিশন নিয়ে অনেক কথা বলা যাবে। আর একটা বড় কাজ—আমরা শহীদ মিনারের যে লম্বা লম্বা মিনারগুলো, তার পেছনে যে লাল গোলটা দেখি, সেটা একান্তভাবেই মুস্তাফা মনোয়ারের তৈরি। তিনি একবার শুটিংয়ে গিয়ে দেখলেন যে ক্যামেরার ফাঁক দিয়ে শুধু দেখা যাচ্ছে মেডিক্যাল কলেজের বারান্দায় রাখা বিভিন্ন কাপড়চোপড়। কারও লুঙ্গি, কারও জামা। তিনি বললেন, ‘এটা কেমন কথা?’

শহীদ মিনারের ফাঁক দিয়ে যদি এই দৃশ্য দেখা যায়, তবে টেলিভিশনের পর্দায় কেমন দেখাবে? সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা করলেন তিনি, বিরাট লাল একটা কাপড় লাগালেন এবং সেটাই পেছন দিকে এখন রয়ে গেছে। এবং তাতে শহীদ মিনারের যে আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে—সেটা সূর্যের প্রতীক, রক্তের প্রতীক, সেটা অবিস্মরণীয়।

.‘বড় হওয়া ভালো না, ছোট থাকাই ভালো’, শিশুমনেই বেঁচে ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার.

মুস্তাফা মনোয়ারের এ ধরনের বহু কাজ নানান জায়গায় নানান ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। তিনি খেলার মাসকট তৈরি করেছিলেন। খেলার সময় শুধু মানুষ দিয়ে স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের পতাকা বা বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করেছিলেন। মুস্তাফা মনোয়ার যে কত রকম চিন্তাভাবনা বাংলাদেশের মানুষকে উপহার দিয়েছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। তাঁর চিন্তায়, তিনি চিরকাল ভেবেছেন, কী করে টেলিভিশনের মাধ্যমে ছোটদের মধ্যে দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ করা যায়। নিজে ভালো গান গাইতেন, কথা বলতে পারতেন, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করতে পারতেন। আর পাপেটশিল্প নিয়ে তাঁর যে অবদান, সেটা তো কখনোই কেউ ভুলতে পারবে না। ‘বাঘা’ ও ‘মিনি’ দুটো চরিত্র দিয়ে তিনি যে পরিমাণ দেশের কথা, দশের কথা বলে গেছেন, সেটা অবিস্মরণীয়।

.

‘মীনা’ যে কার্টুনটি ইউনিসেফের রয়েছে, সেই কার্টুনের মূল টিমের মধ্যেও মুস্তাফা মনোয়ার একজন ছিলেন। তাঁকে নিয়ে আসলে লিখে শেষ করা যাবে না, বলে শেষ করা যাবে না। তাঁকে জানার জন্য, তাঁকে বোঝার জন্য আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন। আর চ্যানেল আই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাটুকু ধরে রেখেছে তাঁর নামে একটি স্টুডিও তৈরি করে। এই স্টুডিওতে আমরা মুস্তাফা মনোয়ারকে নিয়ে এসেছিলাম। তাঁকে নিয়ে স্মরণ করে আরও কিছু করব, এই আমাদের প্রত্যাশা। মুস্তাফা মনোয়ার সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, এটা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না।