দেশে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির অনুমোদন পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দেশের বাজারে চলমান সংকট ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনটি শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাকে এলপিজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

গতকাল মঙ্গলবার বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসানের কাছে এই অনুমোদনের চিঠি পাঠানো হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব শাহিনা আক্তার চিঠিতে সই করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান নীতিমালা ও প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করে তিনটি শর্ত সাপেক্ষে বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হলো। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনা করে আগ্রহী অপারেটরদের তালিকা প্রস্তুত, আমদানির পরিমাণ নির্ধারণ, মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি এবং খালাস ও বণ্টনপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা। এসব বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে।

এ ছাড়া বিপিসির তালিকাভুক্ত সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) সরবরাহকারী এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যান্য সম্ভাব্য উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত ক্রয়বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি আমদানি করা বাল্ক এলপিজি কেবল অনুমোদিত অপারেটরদের কাছেই সরবরাহ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে বিপিসি কোনো ধরনের বোতলজাতকরণ কার্যক্রমে যুক্ত হবে না। বাল্ক এলপিজি বলতে বড় ট্যাংক বা জাহাজে আনা এলপিজিকে বোঝায়। এই এলপিজি পরে বেসরকারি অপারেটররা নিজেদের টার্মিনালে বোতলজাত করে বাজারে ছাড়েন।

এর আগে ১০ জানুয়ারি এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়েছিল বিপিসি। চিঠিতে বলা হয়, দেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় সংকটের সময় সরকারিভাবে বাজারে হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত। ফলে সরবরাহঘাটতি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তা মোকাবিলার কার্যকর কোনো হাতিয়ার সরকারের হাতে থাকে না। বিপিসির ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এবার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হলো।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিগগিরই লোয়াবের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করা হবে। শর্ত অনুযায়ী লোয়াবের কাছ থেকে এলপিজি নিতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের তালিকা সংগ্রহ করা হবে। এরপর দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। সব মিলিয়ে এলপিজি আমদানি শুরু হতে অন্তত দুই মাস সময় লাগতে পারে।

বিপিসির পরিচালক এ কে এম আজাদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শর্ত অনুযায়ী আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইতিমধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। কে কতটুকু এলপিজি নিতে আগ্রহী, তার তালিকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে বর্তমানে জাহাজের সংকট চলছে, জাহাজভাড়াও বেশি। এসব কারণে আমদানি করতে অন্তত দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে।’

দেশে চলমান এলপিজি সংকট কাটাতে বিপিসির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চান বলে জানিয়েছেন লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বাজারে চলমান সংকট মোকাবিলায় বিপিসির এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ইতিমধ্যে তাঁদের একাধিক বৈঠক হয়েছে। সামনে আমদানির বিষয়েও যৌথভাবে কাজ করা হবে।

দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এত দিন বেসরকারি খাতই মূলত এলপিজি আমদানি করে এসেছে। এবারই প্রথম সরকারিভাবে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলো।

সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টন। একই সময়ে সরকারি খাতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৯ হাজার ৪৭৯ টন, যা মোট বাজারের প্রায় ১ শতাংশ। এর বাইরে তিনটি বেসরকারি রিফাইনারিতে উৎপাদিত এলপি গ্যাসও বাজারে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন।

তবে আমদানির অনুমোদন মিললেও বোতলজাতকরণ ও সরবরাহের নিজস্ব সক্ষমতা না থাকায় বিপিসি সরাসরি ভোক্তার কাছে এলপিজি বিক্রি করতে পারবে না। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে বিপিসির সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বিপিসি গত এক যুগে কয়েকটি এলপিজি অবকাঠামো প্রকল্পের কথা ভাবলেও কোনোটিই বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ২০১২ সালে মোংলা বন্দর শিল্প এলাকায় এবং ২০১৪ সালে সীতাকুণ্ডে বার্ষিক এক লাখ টন সক্ষমতার এলপিজি মজুতাগার ও সরবরাহ প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাতারবাড়ীতেও বড় আকারের এলপিজি টার্মিনালের পরিকল্পনা ছিল। তবে তিন প্রকল্পেরই সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যকরভাবে এগোয়নি।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মাতারবাড়ীতে টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরের উত্তর কাট্টলি এলাকায় একটি এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হবে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ভবিষ্যতে বিপিসিকে ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে বোতলজাতকরণ, সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য নতুন অবকাঠামো ও প্ল্যান্ট স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, বিপিসি তেল বিক্রি করে নিয়মিত মুনাফা করছে। সর্বশেষ অর্থবছরেও প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। সে হিসেবে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।