দেশে কৃষি ও অকৃষি পল্লিঋণ বিতরণের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে ঋণ বিতরণের চেয়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে অনেক বেশি। গত এক বছরে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৯৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের সর্বশেষ মে মাসের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন চিত্র দেখা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালার প্রভাবে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের মে মাসের শেষে কৃষি খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। গত মে মাসের শেষে তা ১৯২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১৩০ কোটি টাকায়।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি খাতের ভূমিকা অনেক। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ; আর দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৬ শতাংশ কৃষি খাতের। এ কারণে কৃষিঋণ বিতরণে সরকারও উৎসাহ দিয়ে থাকে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়। তার পরও এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি।
কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকে। কৃষি খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬৫ শতাংশই এসব ব্যাংকে। গত বছর মে মাস শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। এক বছরে তা ৩৯৩ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা হয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কৃষিতে খেলাপি ঋণ ৬৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৪৬ কোটি টাকায়, যা গত বছর মে মাসের শেষে ছিল ৩ হাজার ৯৯ কেটি টাকা।
অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৬৪ শতাংশ। তাতে গত মে মাসের শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে ৯৩৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া কৃষি খাতে অন্যান্য বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১৪ শতাংশ বেড়ে ৮৬০ কোটি টাকা হয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতে কোনো খেলাপি ঋণ নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি খাতের অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে জারি করা নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির নীতিমালা। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণের কিস্তি বা সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধের মেয়াদের পরের দিন থেকেই তা ওভারডিউ বা বকেয়া হিসেবে গণ্য হবে। বকেয়ার মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে ঋণকে নিয়মিত ও খেলাপি হিসেবে ভাগ করা হয়। মূলত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কঠোর করায় এবং গ্রেস পিরিয়ড বা ছাড়ের সুবিধা কমিয়ে আনায় কৃষিতে বিপুল পরিমাণ ঋণ একসঙ্গে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশের বেশি ঋণ বিতরণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের ৫৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ৩৯ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাস শেষে (জুলাই-মে) অর্থাৎ গত ১১ মাসে ব্যাংকগুলো প্রায় ৩৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা বিতরণ করতে পেরেছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৮ শতাংশ। এর বাইরে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) কৃষি খাতে ১ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। ব্যাংক ও বিআরডিবি মিলিয়ে মে মাস পর্যন্ত মোট কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কৃষিঋণ বিতরণ ১৭ শতাংশ বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯১৫ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। এরপর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বিতরণ কিছুটা কমলেও গত এপ্রিল ও মে মাসে তা আবার গতি ফিরে পায়।






