সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর করে এলেন। তিনি মালয়েশিয়া গেলেও মানুষের আগ্রহ ছিল মূলত তাঁর চীন সফরকে ঘিরে। কয়েক দিন ধরে আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম এবং জনপরিসরের এক বড় আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল এই সফর থেকে বাংলাদেশ কতটা প্রাপ্তি নিয়ে ফিরে আসতে পারে। যে কারণে এই সফর ঘিরে মিডিয়া হাইপও অনেক বেশি ছিল।

চীন সফরের পরে একটি যৌথ বিবৃতিও প্রকাশ করা হয় দুই সরকারের যৌথ সম্মতিতে। চীন সফরের প্রাপ্তি নিয়ে যদি আমরা মূল্যায়ন করি তাহলে মোটাদাগে বেশ কিছু ইতিবাচক ও চ্যালেঞ্জ আমরা সামনে নিয়ে আসতে পারি।

প্রথমত, এই সফরের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বর্তমান সরকারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের একটি বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পাবে এবং গাঢ় হবে। এর মাধ্যমে এই সরকারের প্রতি চীন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, ফলে চীনের ব্যবসায়ীরা আরও আস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন।

বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো—একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। যে স্থিতিশীলতা বর্তমান সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যা বিগত কয়েক বছর বাংলাদেশে ছিল না। এখানে আলোচনায় রয়েছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মোংলা বন্দর নিয়ে যৌথ কার্যক্রমের প্রস্তাবনা ও প্রত্যাশা, যার মাধ্যমে বিনিয়োগ আসতে পারে।

.

তবে এ দুটি বিষয়ে যেহেতু চুক্তি হয়নি, এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাংলাদেশ কী করে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ধরে রাখে তার ওপর। আর তাই চীনের সমাজ, সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্ব বোঝার একটি প্রচেষ্টা আমাদের মধ্যে থাকতে হবে, যার মাধ্যমে একটি টেকসই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। ফলে এই সফরকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ধাপ হিসেবে আমরা দেখতে পারি।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বক্তব্যের মধ্যেও আমরা সেই সম্পর্কের প্রতি জোর দিতে দেখি, যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার বাবা-মা দুজনেই চীনের জনগণের বন্ধু ছিলেন।’ আবার ইতিহাস বলে বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে মূলত ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের চীন সফরের মধ্য দিয়ে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের যে প্রস্তাবনা এসেছে, তা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমূল বদলে দিতে পারে। বিগত সময়ে আমরা মানবিক করিডরের আলাপ শুনেছিলাম, যার উদ্দেশ্য ছিল মূলত মিয়ানমারে অবস্থিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য সরবরাহ করা। এখন যদি মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরির আলাপ চলে তাহলে সরকারকে সাহসী, কার্যকর এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

.চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের দর–কষাকষির সক্ষমতা বাড়াবে.

তবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, এই ধরনের অর্থনৈতিক করিডরের আলাপও কিন্তু নতুন নয়। আমরা জানি যে বিগত সময়ে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) নামক একটি করিডর প্রতিষ্ঠায় ২০১৩ সালে নীতিগতভাবে এই চার দেশের সরকার সম্মত হয়; কিন্তু চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতির কারণে সেটি এগোতে পারেনি। যেহেতু ভারতের কারণে এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি এবং বর্তমান সময়ে যখন বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে নতুন একটি করিডরের কথা আলোচনা হচ্ছে, সে বিষয়টি স্বভাবতই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একধরনের মনস্তাত্ত্বিক এবং কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ কী করে সেই জটিলতা এড়াতে পারে, সেটাই হবে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতার একটি অন্যতম সাফল্য।

তবে এই নতুন প্রস্তাবনা এখনো কেবলমাত্র আলোচনার টেবিলেই রয়েছে। বাস্তবিক অর্থে এটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না, সেটি নির্ভর করবে বাংলাদেশ এবং আঞ্চলিক দেশগুলো নানাবিধ ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও টানাপোড়েনের মীমাংসা কী করে করে তার ওপরে। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যেহেতু মিয়ানমার যুক্ত থাকবে, সেই ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা করতে হবে কী করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধানের আলোচনাও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে পারি।

.

অবশ্য আমরা এই সফর থেকে জানতে পারি যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে রাজি আছেন। তবে বিষয়টি আসলে নতুন নয়, কেননা চীনের মধ্যস্থতাতেই একটি ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রচেষ্টা শুরু হয় ২০২১ সালে। ফলে আমরা সেই প্রচেষ্টাকেই আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

এর জন্য প্রয়োজন আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, যে কর্মপরিকল্পনা আমরা বিগত নয় বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় খুব একটা দেখতে পাইনি। বরং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রোহিঙ্গা সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, এর সঙ্গে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে রয়েছে তহবিলের চরম সংকট।

তৃতীয়ত, উভয় দেশ সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা, নদীর পানিপ্রবাহের পূর্বাভাস ও তথ্য বিনিময়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং নদী খননের (ড্রেজিং) ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এখানে প্রধান বিষয় হিসেবে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প এবং সামুদ্রিক বিষয়াবলি, যেখানে সুনীল অর্থনীতির বিষয়গুলো আসছে। যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়। তিস্তা প্রকল্প উত্তরবঙ্গের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা পালন করবে। অপর দিকে সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায় অনাবিষ্কৃত একটি খাত। তাই এসবের বাস্তবায়ন হলে আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফলাফল দৃশ্যমান হবে।

.যুক্তরাষ্ট্র–চীন: দুই পরাশক্তির বিশ্বে বাংলাদেশ কী করবে.

চতুর্থত, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রমের সহযোগিতামূলক চর্চা আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখে আসছি। কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় পরিসরে এই সমঝোতাগুলো হয় তখন কার্যক্রমগুলো আরও বেশি সুনির্দিষ্ট ও ফলাফলকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। যেহেতু বিএনপি সরকার কারিগরি শিক্ষার দিকেও মনোযোগী তাই এই বিষয়েও বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতা নিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারবে।

এ ছাড়া এই সফরের মধ্য দিয়ে অন্য যেসব সমঝোতামূলক স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে সেগুলোর সবকিছু হয়তো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না; কিন্তু এর মাধ্যমে সম্ভাবনার দরজা খোলার বিষয়টা আমরা এখানে দেখতে পাই। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই সমঝোতামূলক স্মারকগুলো থেকে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প হাতে নিতে পারে, কতটা প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে, এবং কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে পরিচালনা করতে পারে।

তবে ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের চীন নীতির অগ্রাধিকারে যে বিষয়গুলো থাকতে হবে সেগুলো হলো; প্রথমত, বিনিয়োগ কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে ক্রমাগত কাজ করে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, চীনের উন্নয়নের যে অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের স্থানান্তর যাতে বাংলাদেশে শিল্পায়নের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং নিজস্ব শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সক্ষমতা তৈরি হয়। তৃতীয়ত, বর্তমানে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বৃহৎ বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে, যা প্রায় ১৭ বিলিয়নের ওপর, তা কমানোর কাজ করা।

.চীন–ভারত: বড় শক্তির ছায়ায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজের ছায়া অক্ষুন্ন রাখবে.

শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানির যে সুবিধা চীন বাংলাদেশকে দিয়েছে তার পুরো সুবিধা বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত নিতে পারছে না। চীনের বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন অনেক পণ্যই বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে, ফলে কী করে বাংলাদেশ সেই পণ্যের সুনির্দিষ্ট মান বজায় রেখে চীনের ভোক্তাদের হাতে তুলে দিতে পারে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

চীনের সঙ্গে আমাদের বর্তমান বাণিজ্য সম্পর্কটা মূলত আমদানিনির্ভর সে জায়গা থেকে বাংলাদেশ যদি রপ্তানিনির্ভর একটি জায়গায় যেতে পারে তাহলে খুব শিগগিরই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। এখানে আমরা বিশেষ করে গার্মেন্টস, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সি ফুড, কিছু কাঁচামালের কথা বলতে পারি, যার রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ আমাদের রয়েছে। যদিও আমরা দেখছি যে বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে; কিন্তু একটি পণ্যকে মাথায় না রেখে রপ্তানি বাজারকে আরও বিস্তৃত করতে হবে।

.

তবে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে কী করে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে, তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর–সংক্রান্ত দুটি অন্যতম প্রধান প্রকল্পের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।

যদিও আমরা বলে থাকি যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিই হবে বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তের কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি; কিন্তু বর্তমান সময়ের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে সেই ধরনের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখা বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের জন্য কঠিন না হলেও সহজ না।

ফলে ভূরাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয় এমন সব প্রকল্প হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যথেষ্ট ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবার এটিও মাথায় রাখতে হবে, কেবল ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণেই দেশের স্বার্থ–সংবলিত প্রকল্প হাতে না নেওয়াও একধরনের বোকামি। এসব বিবেচনায় বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অনুসরণ হতে পারে একটি সমাধান।

  • বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও পরিচালক, বাংলাদেশ-চায়না রিসার্চ সেন্টার, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত লেখকের নিজস্ব