দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি এসএমই। তবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও অর্থায়নের অভাবে অনেক উদ্যোক্তা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক সেবার বাইরে রয়েছেন। এ খাতে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিয়ে মুক্তকণ্ঠর সঙ্গে কথা বলেছেন আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম জামাল উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক

.

ব্যাংকের তুলনায় আইডিএলসির ঋণ বিতরণপ্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও লালফিতার দৌরাত্ম্যমুক্ত?

.

এম জামাল উদ্দিন: অনেক ব্যাংকে ঋণের জন্য নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা ও বারবার শাখায় যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। আইডিএলসিতে এই ঝামেলা নেই; গ্রাহকের বিদ্যমান ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই অর্থ লেনদেন করা যায়। আমরা প্রত্যেক গ্রাহকের জন্য একজন নির্দিষ্ট রিলেশনশিপ ম্যানেজার (আরএম) নিয়োগ করি, যিনি গ্রাহকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা বাসায় গিয়ে নথিপত্র সংগ্রহ ও যাচাই করেন। ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে আমরা ‘স্ট্রেইট থ্রু প্রসেসিং’ (এসটিপি) পদ্ধতি অনুসরণ করি, যার মাধ্যমে যোগ্য গ্রাহকেরা মাত্র দু-তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ পেয়ে যান। সিআইবি যাচাইসহ প্রাথমিক মূল্যায়ন শুরুতেই করায় উদ্যোক্তারা দ্রুত তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

.

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণে নতুন কী সুবিধা থাকছে?

.

এম জামাল উদ্দিন: আমাদের মোট এসএমই পোর্টফোলিওর প্রায় ১৫ শতাংশ নারী নেতৃত্বাধীন ব্যবসা। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আমাদের বিশেষায়িত পণ্য রয়েছে। যেমন ‘মৌসুমি ঋণ’-এর ক্ষেত্রে প্রথম তিন মাস শুধু সুদ পরিশোধ করতে হয়, মৌসুম শেষে মূল ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকে। আবার ‘স্ট্রাকচার্ড ঋণ’-এ ব্যবসার আয় অনুযায়ী কিস্তি নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ সেবা ‘পূর্ণতা’। আমাদের ফিমেল আরএম টিম এবং প্রতিটি শাখায় নির্ধারিত ডেস্কের মাধ্যমে নারীদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার পরামর্শ দেওয়া হয়। নারী উদ্যোক্তাদের বাজার সংযোগ বাড়াতে আমরা বছরে দুবার ‘পূর্ণতা উৎসব’ (এসএমই মেলা) আয়োজন করি।

.

৬০% উদ্যোক্তা নথিপত্রের অভাবে ব্যাংকিং সেবার বাইরে—এনবিএফআই হিসেবে আপনারা এই বাধা কীভাবে দূর করছেন?

.

এম জামাল উদ্দিন: ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক নথি সংগ্রহ ও হালনাগাদ করা অনেকের জন্য জটিল। আমাদের আরএম টিম গ্রাহকদের এসব কাগজপত্র প্রস্তুত ও নবায়ন পদ্ধতিতে সরাসরি সহায়তা করে। আমরা নিয়মিত আর্থিক সাক্ষরতা ও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণও দিই। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা জরুরি। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫ বছর মেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স বা ডিজিটাল সনদ সংগ্রহ ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা কারখানা লাইসেন্সের মতো প্রক্রিয়াগুলো আরও সহজ ও ডিজিটাল করা হলে দেশের এসএমই খাত আরও শক্তিশালী হবে।

.

ঋণ দেওয়া ছাড়াও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আইডিএলসি কী সহায়তা দিচ্ছে?

.

এম জামাল উদ্দিন: আমরা মুক্তকণ্ঠর সঙ্গে যৌথভাবে ‘এসএমই পুরস্কার’ আয়োজন করে সফল উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি দিয়ে আসছি। এ ছাড়া নতুন ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ এবং ‘পূর্ণতা উৎসব’-এর মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের নেটওয়ার্কিং ও ব্র্যান্ড পরিচিতির সুযোগ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি কেরানীগঞ্জের শীতবস্ত্র প্রস্তুতকারকদের মতো বিভিন্ন ব্যবসায়িক ক্লাস্টারের জন্য আমরা বিশেষায়িত ক্লাস্টারভিত্তিক লোন সুবিধা দিচ্ছি। 

.

বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সিএমএসএমই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আপনার প্রধান পরামর্শ কী?

.

এম জামাল উদ্দিন: উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক সংকটের এই সময়ে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, এসএমই খাতে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে হবে। এ জন্য আমরা একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে ‘প্রবাহ’ নামের ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং মডেল চালু করেছি। দ্বিতীয়ত, এফ-কমার্স বিচ্ছিন্ন ব্যবসাগুলোকে একটি ‘জাতীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম’-এর আওতায় এনে সংগঠিত করতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তারাও বড় বাজার পান। তৃতীয়ত, সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।