২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে একমাত্র ছেলেকে হারানোর পর যে পরিবার একসঙ্গে শোক বয়ে বেড়াচ্ছিল, এক বছরের মাথায় সেই পরিবারই এখন দুই ভাগে বিভক্ত। শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, সরকারি অনুদানের অর্থ এবং ‘বংশধর’ রাখার যুক্তিকে ঘিরে মুখোমুখি এখন তাঁর মা–বাবা।
শাহরিয়ারের বাবা শেখ আবদুল মতিন গত ২৯ মে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তাঁর দাবি, পরিবারের চাপে এবং ‘বংশধর’ রাখার প্রয়োজনেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে প্রথম স্ত্রী শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম বলছেন, তাঁর অনুমতি ছাড়াই এই বিয়ে হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শহীদ ছেলের জন্য পাওয়া সরকারি অনুদান ও ভাতার অর্থের অপব্যবহারও হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
এই অভিযোগ নিয়ে মমতাজ বেগম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বামীর কর্মস্থল আলফা গ্রুপ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের মেসেঞ্জার গ্রুপে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। এমনকি ছেলের নামে তাঁর স্বামী যে সরকারি অনুদান ও মাসিক ভাতা পান, ভবিষ্যতে তা স্থগিত করারও আবেদন জানিয়েছেন।
.২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে গুলিবিদ্ধ হন শাহরিয়ার। গুলি তাঁর ডান চোখের পাশ দিয়ে মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ১৯ দিন।
.শাহরিয়ারের বাবা শেখ আবদুল মতিন গত ২৯ মে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তাঁর দাবি, পরিবারের চাপে এবং ‘বংশধর’ রাখার প্রয়োজনেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।.
২৫ জুন রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে মমতাজ বেগম প্রকাশ্যে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। তার পর থেকে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া শাহরিয়ারের পরিবারের এই সংকট এখন অন্য শহীদ পরিবারগুলোকেও বিব্রত করছে।
২৭ জুন মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় শেখ আবদুল মতিন ও মমতাজ বেগমের সঙ্গে। দুজনেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন।
.১৪ জুন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে মমতাজ বেগম বলেন, দ্বিতীয় বিয়ের পর তাঁর স্বামী প্রথম স্ত্রী ও মেয়ের প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করছেন। শহীদ ছেলের জন্য পাওয়া সরকারি অনুদান ও মাসিক ভাতা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ব্যয় করছেন।
.মমতাজ বেগম আরও লিখেছেন, এসব ঘটনার কারণে তিনি ও তাঁর মেয়ে একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।
.ছেলে শহীদ হওয়ার সময় তাঁর স্বামী বেকার ছিলেন। অথচ তিনিই নির্বাচনের আগে নির্বাচন করার জন্য হুলুস্থুল শুরু করেছিলেন। এখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।—মমতাজ বেগম, শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের মা
মমতাজ বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, জুলাই শহীদ হিসেবে এককালীন পাওয়া ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের অর্ধেক তিনি এবং অর্ধেক তাঁর স্বামী এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ১০ হাজার টাকা তাঁর স্বামী ও ১০ হাজার টাকা তিনি আলাদা অ্যাকাউন্টে পান।
মমতাজ বলেন, তাঁর স্বামী বরাবরই আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিলেন। এত টাকা একসঙ্গে দেখে এখন তাঁর ‘মাথা ঠিক নেই’।
এই নারী বলেন, ছেলে শহীদ হওয়ার সময় তাঁর স্বামী বেকার ছিলেন। অথচ তিনিই এবার নির্বাচন (ফেব্রুয়ারিতে) করার জন্য হুলুস্থুল শুরু করেছিলেন। এখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
.প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই এই বিয়ে হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শহীদ ছেলের জন্য পাওয়া সরকারি অনুদান ও ভাতার অর্থের অপব্যবহারও হয়েছে বলে অভিযোগ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বামীর কর্মস্থল আলফা গ্রুপ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের মেসেঞ্জার গ্রুপে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম। এমনকি ছেলের নামে তাঁর স্বামী যে সরকারি অনুদান ও মাসিক ভাতা পান, ভবিষ্যতে তা স্থগিত করারও আবেদন জানিয়েছেন।.
তাঁর অভিযোগ, শহীদ ছেলের অনুদানের টাকায় স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন—এটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
মমতাজ ও মতিনের ২২ বছরের দাম্পত্য জীবনে ১০ বছর বয়সী একটি মেয়েও রয়েছে। এখনো তাঁদের মধ্যে তালাক হয়নি বলে জানান মমতাজ।
.অভিযোগ অস্বীকার করে শেখ আবদুল মতিন বলেন, তিনি বৈধভাবেই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। প্রমাণ হিসেবে এপ্রিল মাসে মেসেঞ্জারে স্ত্রীকে পাঠানো বার্তার একটি স্ক্রিনশটও দেখান তিনি।
.বৈধভাবেই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, প্রথম স্ত্রীর আর সন্তান ধারণের সক্ষমতা নেই। তাই পরিবারের বংশধর চাওয়া এবং সংসার দেখাশোনার প্রয়োজনেই দ্বিতীয় বিয়ে করেছি।—শেখ আবদুল মতিন, শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবা
তবে মমতাজ বেগম বলছেন অন্য কথা। তাঁর দাবি, স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে থেকে বিরত রাখতেই তিনি নানা চেষ্টা করেছিলেন। মেসেঞ্জারে অভিমান করে লেখা একটি বার্তাকেই তাঁর স্বামী এখন অনুমতির প্রমাণ হিসেবে হাজির করছেন।
‘অভিমান করে লেখা কোনো কথা কখনো দ্বিতীয় বিয়ের আইনি অনুমতি হতে পারে না,’ বলেন মমতাজ বেগম।
শেখ আবদুল মতিন আলফা গ্রুপের সেলস বিভাগে কর্মরত ছিলেন। মমতাজ বেগম ৬ জুন আলফা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এর পর থেকেই তিনি চাকরিতে নেই বলে স্বীকার করেছেন আবদুল মতিন।
আবদুল মতিনের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কুমড়াশাসন উত্তরপাড়া গ্রামে। তিনি বলেন, মা ও ভাইবোনদের চাপে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর প্রথম স্ত্রীর আর সন্তান ধারণের সক্ষমতা নেই। তাই পরিবারের বংশধর চাওয়া এবং সংসার দেখাশোনার প্রয়োজনেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আর প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে ঢাকার বাসায় তিনি পাঁচবার গেলেও স্ত্রী দরজা খোলেননি।
.২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে গুলিবিদ্ধ হন শাহরিয়ার। গুলি তাঁর ডান চোখের পাশ দিয়ে মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ১৯ দিন।.
শহীদ ছেলের জন্য পাওয়া সরকারি অনুদানের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করেন আবদুল মতিন। তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী ছেলের অনুদানের টাকার সমান ভাগ পেয়েছেন। স্ত্রীর ভাগের টাকায় তিনি হাত দেননি।
.শাহরিয়ার ছিলেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ আইডিয়াল কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। মাত্র পাঁচটি পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় ২০২৪ সালের ১০ জুলাই তিনি ঢাকায় মায়ের কাছে আসেন।
পরে মিরপুর-২ নম্বরে খালার বাসায় বেড়াতে গিয়ে খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন শাহরিয়ার। ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে তাঁরা দুজনই গুলিবিদ্ধ হন। পরে শাহরিয়ারের মৃত্যু হয়। শাহরিয়ারকে ঈশ্বরগঞ্জের নিজ বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মৃত্যুর পর প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলে শাহরিয়ার জিপিএ–৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এর আগে সিলেটের ব্লুবার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পেয়েছিলেন তিনি।
মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমি আর আমার মেয়ে মানসিকভাবে খুব খারাপ অবস্থায় আছি। মেয়েটা মাত্র ৮ বছর বয়সে একমাত্র ভাইকে হারিয়েছে। আর এখন বাবাকেও হারিয়ে ফেলল।’
মেয়ে বাবাকে বলেছে, বড় হয়ে সে বাবাকে দেখে রাখবে। কিন্তু বাবা বলেছে, মেয়েরা তো শ্বশুরবাড়ি চলে যায়।’






