দীর্ঘদিন ঢাকায় প্রাইভেট কারের চালক হিসেবে চাকরি করতেন নাজমুল ইসলাম। পরিবার নিয়ে জীবন স্বাচ্ছন্দ্যেই চলছিল। কিন্তু করোনা মহামারিতে চাকরি খুইয়ে তিনি গ্রামে ফিরতে বাধ্য হন। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। বাড়িতে জমি বলতে যা ছিল, বেশির ভাগই লবণাক্ত। কৃষিকাজেরও অভিজ্ঞতা ছিল না। পরে লবণাক্ত জমিতে আরেক কৃষকের ‘সরজান’ পদ্ধতিতে সমন্বিত খামার করা দেখে আগ্রহী হন তিনি।
নাজমুলের বাড়ি ঝালকাঠি সদর উপজেলার বড় সাড়াপাড়া গ্রামে। তিনি প্রথমে ৪০ শতাংশ লবণাক্ত জমিতে সরজান পদ্ধতিতে ১৫০টি পেয়ারাগাছ লাগান। পাশাপাশি নালায় মাছ চাষ শুরু করেন। নালার ওপর মাচা তৈরি করে লতাজাতীয় সবজি, পেঁপে ও ছোট আকারের তরমুজের চাষও করেন। পরে সাফল্য দেখে চাষাবাদ সম্প্রসারণ করেন আরও ১৬০ শতাংশ জমিতে। বর্তমানে পেয়ারা, মাছ, সবজি ও অন্যান্য ফসল মিলিয়ে তাঁর বার্ষিক আয় প্রায় ছয় লাখ টাকা।
সম্প্রতি বরিশাল-বানারীপাড়া মহাসড়ক থেকে দক্ষিণে সরু পাকা সড়ক ধরে কিছু দূর এগোতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। চোখ জুড়িয়ে যায় চারপাশের সবুজে। সারি সারি গাছের ডালে ঝুলছে অসংখ্য পেয়ারা। নিচে নালায় চাষ করা হয়েছে মাছ। নাজমুল এই সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন। আজ তাঁর খামার স্থানীয় কৃষকদের অনুকরণীয় উদাহরণ। অথচ কয়েক বছর আগেও কৃষি তাঁর পেশা ছিল না।
নাজমুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় চাকরি করার সময় কখনো ভাবিনি কৃষিকাজ করব। কিন্তু গ্রামে ফিরে বুঝলাম, কিছু একটা না করলে পরিবার চালানো সম্ভব নয়। এর পর থেকেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করি।’
পিরোজপুরের নেছারাবাদ, বরিশালের বানারীপাড়া ও ঝালকাঠি সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শত শত বছর ধরে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে। সেই ঐতিহ্য থেকে নাজমুলের মাথায় পেয়ারা চাষের ভাবনা আসে। কিন্তু শুধু পেয়ারা চাষের আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে একদিন পাশের বানারীপাড়া উপজেলার গাভা গ্রামের কৃষক রাশেদুল ইসলামের একটি সমন্বিত পেয়ারার বাগান দেখতে যান নাজমুল। সেখানে পেয়ারার পাশাপাশি মাছ, লতাজাতীয় সবজি, পেঁপে ও অন্যান্য ফসলের চাষ দেখে বিস্মিত হন।
খামারটি ছিল বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ। সেখানে সরজান পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হচ্ছিল। নাজমুল বলেন, ‘খামারটা দেখে মনে হয়েছিল, এটাই আমার পথ। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, এমন একটি খামার গড়ে তুলব।’
দক্ষিণাঞ্চলের জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার সমস্যা মোকাবিলায় বহু বছর ধরে সরজান পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মূলত জমির মাটি তুলে উঁচু বেড বা কাঁদি তৈরি করা হয়। মাঝখানে রাখা হয় অপেক্ষাকৃত নিচু নালা। উঁচু অংশে ফল ও সবজি চাষ করা যায় আর নালার পানিতে মাছ। একই জমিতে একাধিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের সুযোগ থাকায় এটিকে সমন্বিত কৃষির অন্যতম সফল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি সহজে নিষ্কাশন হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে নালায় সংরক্ষিত পানি সেচকাজে ব্যবহার করা যায়।
কৃষি গবেষকদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় সরজান পদ্ধতি কৃষকদের জন্য কার্যকর কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যখন কৃষিজমি নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন একই জমিতে মাছ, ফল ও সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকেরা ঝুঁকি কমাতে ও আয় বাড়াতে পারছেন।
সরজান পদ্ধতির আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পটুয়াখালীর লেবুখালীর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলিমুর রহমান। তিনি বরিশালের আটঘর-কুড়িয়ানার দেশি জাতের পেয়ারার মূল গাছের সঙ্গে বারি-২ জাতের পেয়ারার সংযোজন (গ্রাফটিং) করে এমন একটি গাছ তৈরি করেন, যার ওপরের অংশে বড় আকারের বারি-২ পেয়ারা ও নিচে স্থানীয় জাতের পেয়ারা ধরে। এ গাছে প্রায় সারা বছরই ফল পাওয়া যায়।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলিমুর রহমানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান নাজমুল। বরিশাল আঞ্চলিক গবেষণা ইনস্টিটিউট ও আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের সহায়তায় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪০ শতাংশ লবণাক্ত জমিতে সরজান পদ্ধতিতে ১৫০টি পেয়ারাগাছ লাগান তিনি। পাশাপাশি নালায় মাছ এবং নালার ওপর মাচা তৈরি করে লতাজাতীয় সবজি, পেঁপে ও ছোট আকারের তরমুজের চাষ করেন।
মাত্র ১০ মাসের মাথায় গাছে ফল ধরা শুরু হয়। প্রথম বছর ফলন কম হওয়ায় পেয়ারা বিক্রি করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। ধীরে ধীরে গাছ পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন বাড়তে থাকে। বর্তমানে শুধু পেয়ারা বিক্রি করেই বছরে প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় করছেন নাজমুল। মাছ, সবজি ও অন্যান্য ফসল মিলিয়ে তাঁর বার্ষিক আয় প্রায় ৬ লাখ টাকা।
সাফল্য দেখে পাশে আরও ৯০ শতাংশ জমিতে দেশি জাতের তেলাপিয়া মাছের চাষ শুরু করেন নাজমুল। এ ছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ জমিতে ২০০টি পেঁপেগাছ লাগিয়ে আলাদা আরেকটি বাগান করেছেন। বাড়িতে বড় পরিসরে একটি ছাগলের খামারের কাজ শুরু করেছেন। বর্তমানে তাঁর খামারে নিয়মিত তিনজন শ্রমিক কাজ করেন। মৌসুমভেদে আরও সাতজন শ্রমিক কাজের সুযোগ পান। নাজমুলের ভাষ্য, ‘কৃষিকে যদি ব্যবসা হিসেবে ভাবা যায় এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, তাহলে লবণাক্ত জমিতে সোনা ফলতে পারে।’
বড় সাড়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর (৫৫) বলেন, ‘এই জমিগুলো একসময় অনাবাদি পড়ে থাকত। লবণাক্ততার কারণে কেউ চাষ করতে চাইত না। প্রথম দিকে আমরা ভেবেছিলাম, নাজমুলের উদ্যোগ ব্যর্থ হবে। এখন দেখি সে সফল হয়েছে। তার খামার দেখে অনেকেই নতুন করে কৃষিকাজের কথা ভাবছেন।’
নাজমুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় কৃষকেরা তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। কীভাবে তাঁরাও এমন খামার গড়ে তুলবেন, সেই পরামর্শ চান। ইতিমধ্যে তিনজন কৃষক একই পদ্ধতিতে খামার গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁদের জন্য তিনি পেয়ারার চারা তৈরি করছেন।
নাজমুল এখন অনেকটা আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘এমন জমিতে কৃষি খামার গড়া অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। এখানে লবণাক্ততা এত বেশি যে আগে কোনো ফসলই হতো না। কিন্তু প্রযুক্তি, পরিকল্পনা আর পরিশ্রম দিয়ে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। আমি চাই, গ্রামের প্রতি ইঞ্চি জমি কাজে লাগুক।’
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলিমুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নাজমুলের মতো উদ্যোগী কৃষকেরাই বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছেন। পুরোনো কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে তাঁরা কৃষিকে আরও লাভবান ও টেকসই করতে চান। তিনি বলেন, বারি পেয়ারা-২-এর জোড় কলম সরজান পদ্ধতিতে চাষ করলে জলমগ্ন বা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এ পদ্ধতিতে সারা বছর ফল পাওয়া যায়।






