‘ইথান আমার একমাত্র পোলা। সকলে আদর কইরা তার নাম রাখছে প্রেম। আমার কলিজার ধন পোলাডার ওপর কেমনে গুলি করল মাদক ব্যবসায়ীরা? আমি আর পোলারে স্কুলে পাঠাইতাম না, আপনেরা সব স্কুল বন্ধ কইরা দেন। আমার পোলাডা যদি না বাঁচে, তাইলে আমিও গলায় ফাঁস দিয়া মইরাম।’

আজ শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে এভাবেই বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদের (১২) মা সোনিয়া আক্তার। ইথান আহমেদ কাটাবিল রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও একই এলাকার ইউনুস মিয়ার ছেলে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরের কাটাবিল এলাকায় বিদ্যালয়ের টিফিন বিরতিতে খাবার খেতে বের হয় ইথান। এ সময় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ থেকে ছোড়া গুলি তার পিঠে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে ইথান সেখানে চিকিৎসাধীন। আজ দুপুর পর্যন্ত অস্ত্রোপচার হয়নি। পিঠে বিদ্ধ হওয়া গুলিটি ইথানের ফুসফুসেও আঘাত করেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

.

সোনিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মাদক কারবারিদের থামাতে না পারলে সরকার দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কইরা দেউক। আমার পুতেরে আমি আর পড়াইতাম না। আমার পুতের জীবনের কোনো গ্যারান্টি নাই। স্কুল থাইক্যা টিফিন খাইতো বাইর হওয়ার পর আমার পুতেরে গুলি কইরা দিছে। আমি গরিব দেইখ্যা কি আমরার কোনো স্বপ্ন নাই? আমার কি মনে কয় না, আমার পুতেরে এমপি বানাইতাম, মন্ত্রী বানাইতাম, পুলিশ বানাইতাম? পুতেরে নিয়া বড় স্বপ্ন ছিল, এই জন্য স্কুলে ভর্তি করাইছি। আমার পুতেরে স্কুলে ভর্তি করানোই আমার দোষ হইছে।’

সোনিয়া আক্তারের অভিযোগ, কাটাবিল এলাকার অপু ও সাব্বির—এই দুই পক্ষের মধ্যে মাদক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। তাঁর ছেলে স্কুলে গেছে, তাকে কেন গুলি করা হলো? তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বাসায়। আমি ঘটনার কিছু জানি না। আমার পোলার গায়ে গুলি লাগছে। পোলাপান এসে কয়, আপনার ছেলের গায়ে গুলি লাগছে। হাসপাতালে যাইয়া দেখি, আমার পোলার গায়ে রক্ত আর রক্ত। তারা আমারে গুলি করত। আমার একটাই পোলা, তারে কেন গুলি করল?’

গতকাল রাতে কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী তাঁর কাছে এসেছেন জানিয়ে সোনিয়া আক্তার বলেন, ‘তিনি আমার পোলার চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে ফোনও দিছেন। কিন্তু এখনো আমার পোলার ভালো কোনো চিকিৎসা হইতাছে না। আমরা গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার টাকাও নাই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার পোলাডার সঠিক চিকিৎসা চাই।’

.মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, টিফিন কিনতে বেরিয়ে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী.

আজ সরেজমিন দেখা যায়, ওই ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এক পাশে কাটাবিল রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়, অন্য পাশে কাটাবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাঝখানে একটি মাঠ। সেখানে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করছেন।

কাটাবিল রফিক উদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আলী আশরাফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ইথান আমাদের নিয়মিত শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটে সে টিফিনে খাবার খেতে বের হয়েছিল। এরপরই আমরা এ ঘটনার খবর পাই। ঘটনার সময় তার ব্যাগও স্কুলে ছিল। আমি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি চাই। পাশাপাশি কাটাবিল এলাকা মাদকমুক্ত চাই। আগামী রোববার এ নিয়ে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করবে।’

ইথানের মামা মোহাম্মদ আসিফ বলেন, ‘মাদক নিয়ে দুই গ্রুপের ঝামেলার সময় আমার ভাগনেকে গুলি করা হয়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি ভাগনের চিকিৎসা। আমরা প্রশাসন ও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি, যেন আমার ভাগনের উন্নত চিকিৎসা হয়। তার জীবনটা শঙ্কার মধ্যে রয়েছে।’

.

ইথানের বাবা ইউনুস মিয়া কুমিল্লা নগর উদ্যানে (শিশুপার্কে) একটি রাইড পরিচালনা করেন। আজ সকালে তিনি মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের গুলি আমার ছেলের পিঠ দিয়ে শরীরের ভেতর ঢুকে গেছে। আমার ছেলেটা তো কোনো অন্যায় করেনি, তাহলে কেন তাকে গুলি করা হলো? আমার ছেলেটা যেন সুস্থ হয়ে ওঠে—দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েকটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। গত বুধবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যানারে মাদকবিরোধী মানববন্ধন কর্মসূচি হয়। কর্মসূচি শেষে একদল অস্ত্রধারী ব্যক্তি সেখানে হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। এতে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ গুলিবিদ্ধসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশের একাধিক দল ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কাজ করছে।

.কুমিল্লায় স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় মামলা, আসামিরা মাদক কারবারি, গ্রেপ্তার ১