গঙ্গার পানি ভাগাভাগিসংক্রান্ত বাংলাদেশ–ভারতের মধ্যকার ৩০ বছরের চুক্তির মেয়াদ এ বছর শেষ হতে যাচ্ছে। গঙ্গা চুক্তির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিরোধপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে অনেক প্রস্তুতির দরকার। চুক্তি নবায়নের জন্য বাংলাদেশ কীভাবে প্রস্তুত হতে পারে, তা নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন নজরুল ইসলাম। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব

.

প্রকৃতিসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গঙ্গা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি হবে ফারাক্কা ব্যারাজের অপসারণ। এটি বাংলাদেশের অনেকের কাছে অসম্ভব দাবি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু খোদ ভারতের অনেকের কাছে তা নয়।

ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে ভারতে জনমনে হতাশা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রথমত, এই ব্যারাজ কলকাতাকে সমুদ্রবন্দর হিসেবে বজায় থাকতে সহায়তা করেনি। দ্বিতীয়ত, এই ব্যারাজ উজানে পলিপতন ও গঙ্গার তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত বন্যা এবং পাড় ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব কারণে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে ভারতে ফারাক্কা বাঁধ অপসারণের দাবিতে জোরালো আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সব মন্ত্রী ও সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ভারতের আন্তরাজ্য পরিষদের (ইন্টার স্টেট কাউন্সিল) ১১তম সভায় নীতীশ কুমার ঘোষণা করেন যে ফারাক্কা বাঁধ উপকারের তুলনায় বরং বেশি অপকার করেছে। এ কারণে তিনি এই ব্যারাজ অপসারণ করে গঙ্গা নদীজুড়ে বাধাহীন প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

.গঙ্গা চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশ কীভাবে প্রস্তুত হতে পারে.

ভারতের জন্য ফারাক্কা বাঁধের কুফলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নীতীশ কুমার ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি দুই দিনব্যাপী ‘অবিরাম গঙ্গা’ শীর্ষক এক সম্মেলনের আয়োজন করেন। ভারতের বহু স্বনামধন্য নদীগবেষক ও নদীকর্মী এই সম্মেলনে যোগ দেন এবং ফারাক্কা ও অন্যান্য বাঁধ দ্বারা নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে পলিপতন ডেকে আনাকে গঙ্গা নদীর মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

‘ভারতের জলমানব’ (ওয়াটারম্যান অব ইন্ডিয়া) বলে খ্যাত রাজেন্দ্র সিং এই সম্মেলনে ফারাক্কা বাঁধকে বিহারের জন্য ‘অশুভ’ ও ‘অভিশাপ’ বলে অভিহিত করে এই বাঁধ অপসারণের দাবি জানান। ভারতের বিশিষ্ট নদীগবেষক হিমাংশু থাক্কার এ সম্মেলনে লক্ষ করেন যে ফারাক্কা বাঁধের প্রায় ৫০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী ২০ বছর পূর্ণ হলেই এ ধরনের বাঁধের মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। সে পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের দাবি জানান।

পাটনায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের ভিত্তিতে একটি ১১ দফাবিশিষ্ট পাটনা ঘোষণা গৃহীত হয়, যার মূল দাবি হয় ফারাক্কা ও অন্যান্য বাঁধ অপসারণ করে গঙ্গার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রবাহের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পাটনা সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের মে মাসে রাজধানী দিল্লিতেও অনুরূপ আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতেও ‘পাটনা ঘোষণা’র অনুবর্তী আরেকটি ঘোষণা গৃহীত হয়।

.

ফারাক্কা ব্যারাজের অপসারণ একটি আকাশকুসুম দাবি নয়। এই দাবি খোদ ভারতেই উদ্ভূত হয়েছে এবং এই দাবির প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন থাকা প্রয়োজন। বস্তুত গঙ্গা চুক্তির নবায়নের আলোচনায় বাংলাদেশের বক্তব্য এই দাবি দিয়েই শুরু করা দরকার।

তবে যত দিন পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজ অপসারিত না হচ্ছে, তত দিন এই ব্যারাজের অধীনেই গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষণীয় ১৯৭৪ সালের ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি’র অধীন ভারত শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) ১১,০০০ থেকে ১৬,০০০ কিউসেক পানি অপসারণের অনুমতি পেয়েছিল, যাতে এই মাসগুলোতে বাংলাদেশ ৪০,৫০০ থেকে ৪৪,৫০০ কিউসেক পানি পেতে পারে।

১৯৭৭ সালের জিয়া সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত ৫ বছর মেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী ভারত শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার ২০,০০০ কিউসেকে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হয়েছিল, যাতে বাংলাদেশ ৩৫,০০০ কিউসেক পানি পায়। এই চুক্তিতে একটি ‘ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতি’মূলক ধারা (মিনিমাম গ্যারান্টি ক্লজ) সংযোজিত হয়েছিল।

এই ধারা অনুযায়ী ভারত নিশ্চয়তা দেয় যে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ ২৭,৬০০ কিউসেকের কম হবে না। ১৯৭৭ সালের চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর দীর্ঘকাল কোনো চুক্তি ছিল না। ফলে এ সময় বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহের পরিমাণ মূলত ভারতের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

.

আওয়ামী লীগ আমলে স্বাক্ষরিত ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী সাব্যস্ত হয় যে ফারাক্কায় প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০,০০০ কিউসেক অপসারণ করবে এবং বাকিটা বাংলাদেশে প্রবাহিত হবে। ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেক হলে বাংলাদেশ ৩৫,০০০ কিউসেক পাবে, আর ভারত পাবে বাকিটা (অর্থাৎ ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ কিউসেক)। সবশেষে, ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেকের কম হলে তা ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।

লক্ষণীয়, এই চুক্তিতে বাংলাদেশে গঙ্গার ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতিমূলক কোনো ধারা নেই। এটা উদ্বেগজনক ছিল, কারণ, আগেই উল্লেখিত হয়েছে, উজানে গঙ্গা এবং এর বিভিন্ন উপনদীর ওপর ভারত কর্তৃক বহু বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণের ফলে ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

পরিসংখ্যান দেখায় যে ১৯৯৭-২০১০ সময়কালে ফারাক্কায় গঙ্গার গড় প্রবাহ প্রতিবছর ২ হাজার ১৩২ কিউসেক করে হ্রাস পেয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের জন্য এই হ্রাস আরও বেশি হবে। ফলে চুক্তিতে যদি বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতি না থাকে, তাহলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যাবে। বস্তুত ১৯৯৭-২০২৫ সময়কালে প্রায়ই তা–ই হয়েছে। গবেষণা দেখায় যে ১৯৯৭-২০১৬ সময়কালে ৫২ শতাংশ সময়ে (প্রতি ১০ দিন ধরে হিসাবকৃত) চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ তার প্রাপ্য পানি পায়নি এবং মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ‘সংকটকালে’র জন্য এই অনুপাত ছিল ৬৫ শতাংশ।

.
২০১৩ সালেই আমি ‘নদীর বিনিময়ে ট্রানজিটের’ প্রস্তাব করেছিলাম। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্য এই প্রস্তাব গ্রহণ না করে বিনা শর্তেই ভারতকে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট ও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ভারতের বিমানবন্দরগুলো ব্যবহারের সুযোগ বাতিল করার পদক্ষেপ দেখায় যে আগে প্রদত্ত সুযোগ–সুবিধা পরে প্রত্যাহারও করা যায়।
.

এই বাস্তবতার আলোকে সন্দেহ নেই যে গঙ্গা চুক্তির আগামী নবায়নে ‘ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতিমূলক’ ধারাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং তা অন্ততপক্ষে ৩৫,০০০ কিউসেকে নির্ধারিত হতে হবে। এ প্রসঙ্গে লক্ষণীয়, যেহেতু কলকাতা এখন আর সমুদ্রবন্দর নয় (নিকটবর্তী হলদিয়া বন্দর সে ভূমিকা গ্রহণ করেছে), সেহেতু ভাগীরথীর দিকে পানির অপসারণ ভারতের জন্য আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অধিকন্তু ভাটিতে ময়ূরাক্ষী, অজয়, দামোদর, সিলাই, রূপনারায়ণ, কংসাবতী (কাসাই) প্রভৃতি উপনদী সংযুক্ত হয়ে ভাগীরথী-হুগলির প্রবাহ বৃদ্ধি করে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রবাহিত গঙ্গার আর কোনো উপনদী নেই, যা এই নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি করতে পারে। বরং আছে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা, যেগুলো সম্পূর্ণই গঙ্গার প্রবাহের ওপর নির্ভর করে। ফলে রাজনীতি ছাড়া ফারাক্কায় গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের আধাআধি ভাগাভাগির তেমন কারণ নেই।

পক্ষান্তরে বাংলাদেশের জন্য ৩৫,০০০ কিউসেক বরাদ্দ রাখার পক্ষে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় ধরনেরই যুক্তি আছে। প্রকৃতির নিয়মেই গঙ্গার মূল প্রবাহ ভাগীরথী থেকে বাংলাদেশের দিকে সরে গেছে। ফারাক্কার মাধ্যমে এটাকে পাল্টে দেওয়ার চেষ্টাই একটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ।

.

অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল গঙ্গার ওপর নির্ভরশীল। আরও লক্ষণীয়, বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত হলে পশ্চিমবঙ্গের উজানে গঙ্গা ও এর উপনদীগুলো থেকে পানি প্রত্যাহারের বর্তমান নিরন্তর প্রয়াসের ওপর ভারত সরকার নিজেও হয়তো কিছুটা লাগাম টানায় প্রবুদ্ধ হবে এবং তা পশ্চিমবঙ্গের অনুকূলে কাজ করবে।

বলাবাহুল্য, গঙ্গা চুক্তির নবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান গৃহীত হতে হলে ভারতের অভ্যন্তরে এর প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি অর্জন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধারাতেই চেষ্টা করা দরকার। বেসরকারি ধারায় বাংলাদেশ ও ভারতের নদীবিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের মধ্যে একটি যোগাযোগ গড়ে উঠেছে, যেটা গঙ্গা চুক্তির নবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য এবং এর পক্ষে যুক্তির সম্প্রচারে সহায়ক হবে, কিন্তু এটা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। সরকারের উচিত এই যোগাযোগ আরও বহুগুণ বিস্তৃত ও গভীর করা।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রয়াস প্রয়োজন। আমরা আগেই লক্ষ করেছি, জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের সনদে স্বাক্ষর নদ–নদী বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও সহানুভূতি লাভের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রয়াসের প্রয়োজন হবে। ভারতের নদী–সংযোগ প্রকল্পের অভিঘাত মূল্যায়নের জন্য একাধিকবার ইউনিসকো প্রেরিত প্রতিনিধিদল ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে সুন্দরবনের অবক্ষয় এবং ভারতের নদী–সংযোগ প্রকল্পের কারণে তা আরও প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা লক্ষ করে এবং তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

.

ইউনিসকোর এই পরিলক্ষণ ফারাক্কা ব্যারাজ অপসারণ কিংবা শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের গঙ্গায় প্রবাহ বৃদ্ধির পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচারাভিযান চালানোর একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু কোনো সরকারই এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বস্তুত আন্তর্জাতিক নদ–নদীর বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের অন্যায্য আচরণ সম্পর্কে বহির্বিশ্বের লোকজন খুব কমই জানেন। গঙ্গা চুক্তির আসন্ন নবায়নের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের এ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

লক্ষণীয় যে ভৌগোলিক অবস্থা ভারতকে বাংলাদেশের নদ–নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করার সুযোগ করে দেয়, তা একই সঙ্গে ভারতের সাপেক্ষে বাংলাদেশকেও কিছু সুবিধা প্রদান করে। সেটা হলো ভারতের উত্তর–পূর্বের সাতটি রাজ্যের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমতি এবং বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো ব্যবহারের সুযোগ প্রদান।

২০১৩ সালেই আমি ‘নদীর বিনিময়ে ট্রানজিটের’ প্রস্তাব করেছিলাম। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্য এই প্রস্তাব গ্রহণ না করে বিনা শর্তেই ভারতকে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট ও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ভারতের বিমানবন্দরগুলো ব্যবহারের সুযোগ বাতিল করার পদক্ষেপ দেখায় যে আগে প্রদত্ত সুযোগ–সুবিধা পরে প্রত্যাহারও করা যায়।

.

আমরা আশা করতে চাই যে ভারত বাংলাদেশের জন্য গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের প্রয়োজনীয়তা আরও সংবেদনশীলতার সঙ্গে উপলব্ধি করবে এবং ৩৫,০০০ কিউসেকের ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তার দাবিটি উদার মনে মেনে নেবে, যার ফলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে এই জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়ের আলোচনা সাফল্যের সঙ্গে করার প্রয়োজন একটি উপযুক্ত ও অভিজ্ঞ টিম বা দল (আলোচকদের গ্রুপ)। বর্তমানে যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশের অংশটি বহুলাংশে আমলানির্ভর। এই কমিশন দিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ কতটুকু সফল হবে, তা বলা কঠিন। এতে শুধু প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্ত করাও সমাধান নয় কারণ, সাধারণত নদ–নদীসংক্রান্ত দর্শনের বিষয়ে তাঁদের পর্যাপ্ত ধারণা ও উপলব্ধি থাকে না। সুতরাং যৌথ নদী কমিশনের যথাযথ পুনর্গঠন ও গঙ্গা চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ও চ্যালেঞ্জ।

.

সবশেষে বলা দরকার, গঙ্গা চুক্তির নবায়নের আসন্ন প্রয়োজনের পটভূমিতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন একটি আত্মহননমূলক পদক্ষেপ। এর ফলে ফারাক্কা ব্যারাজ অপসারণের দাবি দূরে থাক, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহের হিস্যা বৃদ্ধি কিংবা ‘ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চিতি’ ইত্যাদি যেকোনো দাবি উত্থাপন করাই কঠিন হবে। ভারতের ঝানু আলোচকেরা দ্রুতই বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের অবস্থানের স্ববিরোধিতা উন্মোচিত করে তাঁদের এসব দাবি নাকচ করে দিতে সক্ষম হবেন। এই দুঃখজনক পরিণতির সম্ভাবনার আলোকে সরকার গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ প্রকল্পের বিষয়ে আবার বিবেচনা করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।