সুন্দরবনের গভীর থেকে একের পর এক গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। রাত তখন সাড়ে ১০টা। শব্দে ঘুম ভেঙে যায় খুলনার কয়রা উপজেলার বনপাড়ের মানুষের। আতঙ্কে অনেকেই ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। অন্ধকারের মধ্যে বনভূমির ভেতরে আগুনের শিখাও দেখা যাচ্ছিল। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চলা ওই গোলাগুলির পর আজ শুক্রবার সকাল থেকে এলাকায় নানা আলোচনা শুরু হয়।
স্থানীয়দের দাবি, সুন্দরবনে কুখ্যাত দুলাভাই বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে কোস্টগার্ড। তবে অভিযান চলমান থাকায় এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি বাহিনীটি।
কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের তেঁতুলতলার চর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কয়রা নদী। নদীর ওপারেই সুন্দরবন। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা বননির্ভর। মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহের জন্য তাঁদের নিয়মিত সুন্দরবনে যেতে হয়। তাই বন থেকে ভেসে আসা টানা গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এত দীর্ঘ সময় ধরে টানা গোলাগুলির ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
তেঁতুলতলার চর গ্রামের বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, ‘রাতভর খুব ভয় পাইছি। প্রায় ৪৫ মিনিট গুলির শব্দ হইছে। গ্রামের মানুষ ঘর থেইকে রাস্তায় নাইমে আইছিল। প্রথমে সবাই ভাবছিল, জাহাঙ্গীর বাহিনী আর দুলাভাই বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। পরে সকালে শুনতিছি, কোস্টগার্ডের সঙ্গে দুলাভাই বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধ হইছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত বলেন, ‘শতাধিক গুলির শব্দ শুনিছি। রাইতের অন্ধকারে গুলির শব্দের পাশাপাশি আগুনের শিখাও দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ঘটনাটি লোকালয় থেকে খুব বেশি দূরে না। আমি মোবাইলে গুলির শব্দের ভিডিও ধারণ করিছি। রাতে মনে হয়েছিল দুই দস্যু বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। সকালে জানতে পারি, কোস্টগার্ডের সঙ্গে দুলাভাই বাহিনীর গোলাগুলি হইছে।’
আজ শুক্রবার সকাল আটটার দিকে সুন্দরবন থেকে বের হয়ে তেঁতুলতলার চর গ্রামের পাশের খোড়লকাঠী বাজারে যান কোস্টগার্ডের কয়েকজন সদস্য। তাঁদের দেখে বাজারে রাতের অভিযানের আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অভিযানের সময় কোস্টগার্ড দুলাভাই বাহিনীকে ঘিরে ফেলে এবং আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। তখন দস্যুরা গুলি চালালে কোস্টগার্ডও পাল্টা গুলি চালায়। তাঁদের দাবি, এতে দস্যু দলের একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দস্যুদের একটি ট্রলারও কোস্টগার্ডের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কোস্টগার্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা আজ সকালে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গত রাত থেকে এখনো পর্যন্ত সুন্দরবনে আমাদের অভিযান চলছে। কুখ্যাত দুলাভাই বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন অভিযানে রয়েছেন। তিনি ফিরে এলে বিস্তারিত জানানো হবে।’
মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান খোকন বলেন, সুন্দরবনে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বনদস্যু চক্র সক্রিয়। মাঝেমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও গত রাতের মতো এত দীর্ঘ সময় ধরে গোলাগুলির ঘটনা অনেক দিন দেখা যায়নি। এতে তেঁতুলতলার চরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ রাতভর আতঙ্কে নির্ঘুম কাটিয়েছেন।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গোলাগুলির ঘটনাটি আমাদের কয়রা টহল ফাঁড়ির আওতাধীন সুন্দরবনের ময়দাফেসা খাল এলাকায় ঘটেছে বলে বনরক্ষীদের কাছ থেকে জেনেছি। বর্তমানে ওই এলাকায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা রয়েছেন।’






