টিফিনের বিরতিতে খাবার কিনতে বন্ধুদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের বাইরে বের হয়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ। টিফিন শেষে শ্রেণিকক্ষে ফেরার কথা থাকলেও সে এখন কাতরাচ্ছে হাসপাতালের শয্যায়। মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে পিঠে গুলিবিদ্ধ হয় এই শিক্ষার্থী।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় শিক্ষার্থী ইথান আহমেদকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। সে কাটাবিল এলাকার ইউনুস মিয়ার ছেলে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ওই শিক্ষার্থীর পিঠে বিদ্ধ হওয়া গুলিটি ফুসফুসেও আঘাত করে। হাসপাতালে তাৎক্ষণিক আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) ফাঁকা না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সাইফুল মালিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনাস্থলে বর্তমানে পুলিশের একাধিক টিমের পাশাপাশি ডিবি পুলিশও কাজ করছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকাটি মাদকপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এই এলাকায় মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। বুধবার রাত থেকে স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। রাতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে এলাকার সচেতন বাসিন্দাদের ব্যানারে একটি পক্ষ মানববন্ধনের আয়োজন করে। সেই মানববন্ধন থেকে এরাকায় মাদক ব্যবসা বন্ধের দাবি এবং আগের রাতের ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। তবে কর্মসূচির শেষে একদল অস্ত্রধারী ব্যক্তি সেখানে হামলা চালায়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এমন সময় বিদ্যালয়ে টিফিন বিরতিতে খাবার কিনতে বের হওয়া ওই শিক্ষার্থীর পিঠে গুলি লাগে। এ ছাড়া উভয় পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হন। অন্য আহত ব্যক্তিদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হালিম বলেন, ‘আমরা মাদকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছিলাম; কিন্তু হঠাৎ হামলার ঘটনা ঘটে। গুলির শব্দে পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। একটি স্কুলপড়ুয়া ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। আমরা এই এলাকা থেকে মাদকের কারবার বন্ধ চাই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক নিয়ে দুটি পক্ষের বিরোধ চলছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক, যাতে আর কোনো নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’

গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থীর মা সোনিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে স্কুলে পড়তে গিয়েছিল। টিফিন খেতে বের হওয়ার সময় তার গায়ে গুলি লাগে। সে কোনো দোষ করেনি। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের বিচার চাই। সকালে আমার ভালো ছেলেটাকে স্কুলে পাঠিয়েছিলাম; আর দুপুরে তাকে হাসপাতালে দেখতে হলো।’

এদিকে ঘটনার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মাহাবুব আলম নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘আমরা সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য স্কুলে পাঠাই। যদি স্কুলের সামনেই গুলি চলে, তাহলে সন্তানদের নিরাপত্তা কোথায়?’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় অন্তত তিনজন বাসিন্দা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বুধবার রাত থেকেই দুটি পক্ষের সংঘর্ষ চলছে। পুলিশ রাতে এলাকায় এসে অবস্থান করায় পরিস্থিতি শান্ত হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিল না। যদি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে রাতেই অভিযান শুরু হতো, তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অপু গ্রুপ ও সাব্বির গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থীকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলি বের করা হবে বলে আমরা জেনেছি।’