মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সপ্তাহে ইসরায়েলকে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিষয়টি শুধু মতবিরোধের নয়; এমন মতবিরোধ অতীতেও হয়েছে। কিন্তু এবার তিনি এমন এক মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন, যা বহু দশক ধরে এই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
সেই ধারণা হলো, ইসরায়েল প্রকাশ্যে মার্কিন কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন তার অবস্থান বদলাতে বাধ্য হবে।
ভ্যান্স সরাসরি বলেছেন, যদি তিনি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতেন, তাহলে পৃথিবীতে অবশিষ্ট একমাত্র শক্তিশালী মিত্রের বিরোধিতা করতেন না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত একটি স্মারক চুক্তিকে সমর্থন করতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
.এ বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর অন্তর্নিহিত বার্তাই আসল। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রশাসন যে বিষয়টি প্রকাশ্যে বলেনি, ভ্যান্স তা সরাসরি স্বীকার করেছেন। তিনি কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে, তার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তার নির্ভরতা আগের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ট্রাম্প প্রশাসন আর ইসরায়েলের আপত্তিকে নিজেদের নীতির ওপর ভেটো হিসেবে মানতে রাজি নয়। এ পরিবর্তন ঐতিহাসিক বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাম্পের ইরান–চুক্তি। এ চুক্তির মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি আলোচনাপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তি কাঠামোয় রূপ দেওয়া। এতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচল এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, সংঘাতের চক্রে না গিয়ে কূটনীতিই স্থিতিশীলতার পথ খুলতে পারে।
.ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নষ্ট করে দিলেন.কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বহু বছর ধরে তিনি ওয়াশিংটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল রাখতে হলে কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রাখা জরুরি। ফলে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের এই নতুন উদ্যোগ তার দীর্ঘদিনের কৌশলের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ইসরায়েলি মহল এই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমে ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে কড়া সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলপন্থী নেতারা এবং রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম এই আলোচনার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করেছে।
এ কৌশল নতুন নয়। অতীতেও নেতানিয়াহু মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনের অবস্থান প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি কংগ্রেসে ভাষণ দিয়ে তৎকালীন পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন।
.সব মিলিয়ে ভ্যান্সের মন্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। এত দিন মার্কিন নেতারা প্রকাশ্যে ইসরায়েলের ওপর নির্ভরতার কথা বলতে এড়িয়ে গেছেন। ভ্যান্স তা স্পষ্ট করে বলেছেন। এত দিন ইসরায়েল ধরে নিয়েছিল, চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব। ভ্যান্স সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে তুলেছেন।.
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন প্রশাসন নরম না হয়ে উল্টে প্রকাশ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ভ্যান্স উল্লেখ করেছেন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আমেরিকার তৈরি ও অর্থায়নে আসে। এ বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উঠে এসেছে। সেটি হলো, ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা অনেকটাই মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষ করে একজন রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্টের মুখে এ মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ট্রাম্পকে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সমর্থকদের একজন হিসেবে দেখা হয়েছে।
ভ্যান্স শুধু কূটনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি বৈরুতের ওপর ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলারও সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এই হামলায় বহু সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এমন পদক্ষেপ চলমান আলোচনাকে ব্যাহত করতে পারে। এতে বোঝা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে চাইছে।
.এ মতবিরোধ শুধু ইরান-চুক্তিকে ঘিরে নয়; এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর কৌশলগত বিভাজন। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, ইরানের সঙ্গে একটি কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারলেই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব। অন্যদিকে নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন, চাপ, প্রতিরোধ এবং মুখোমুখি অবস্থানই এই অঞ্চলে ভারসাম্য রক্ষার উপায়। এ দুই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু কৌশলের পার্থক্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে দুই বিপরীত ধারণা।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নেতৃত্ব ধরে নিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা মূল্যায়নের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মেলাবে। ভ্যান্সের মন্তব্যে সেই ধারণা ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
এ ছাড়া একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গাজা ও লেবাননে যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বহু ঐতিহ্যগত মিত্রদেশের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
ভ্যান্স এ বাস্তবতাকে সরাসরি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল—ইসরায়েলের বিকল্প এখন আগের চেয়ে অনেক কম।
.‘গ্রেটার ইসরায়েলের’ স্বপ্ন যেভাবে ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর জন্য বুমেরাং হলো.তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশের সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। সামরিক, গোয়েন্দা, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক স্তরে দুই দেশের সম্পর্ক এখনো গভীর ও সুদৃঢ়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জোটের চরিত্র বদলায়। এখানে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তন হলো একধরনের পুনর্গঠন।
ওয়াশিংটন হয়তো ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, কিন্তু আঞ্চলিক বৃহত্তর স্বার্থের প্রশ্নে ইসরায়েলের অবস্থানকে অন্ধভাবে সমর্থন করবে না। ভবিষ্যতে মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন এবং নির্দিষ্ট কোনো সরকারের নীতির প্রতি সমর্থনের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।
সব মিলিয়ে ভ্যান্সের মন্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। এত দিন মার্কিন নেতারা প্রকাশ্যে ইসরায়েলের ওপর নির্ভরতার কথা বলতে এড়িয়ে গেছেন। ভ্যান্স তা স্পষ্ট করে বলেছেন। এত দিন ইসরায়েল ধরে নিয়েছিল, চাপ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব। ভ্যান্স সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে তুলেছেন।
এ কারণেই তাঁর সতর্কবার্তা শুধু ইরান ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হয়তো ভবিষ্যতে সেই মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে, যখন প্রথমবার কোনো শীর্ষ মার্কিন নেতা প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন, ইসরায়েলকে ঘিরে অন্ধ সমর্থনের যুগ শেষের পথে এবং নতুন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে দুই দেশের সম্পর্ক, যেখানে প্রাধান্য পাবে মার্কিন স্বার্থ, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং বদলে যাওয়া রাজনৈতিক হিসাব।
সাইদ এরাকাত ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিক।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ






