হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে ১৬ বছরের কিশোর মো. মাইমুল ইসলাম। ডান পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় মোটা ব্যান্ডেজ লাগানো। সামান্য নড়াচড়াতেও ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে সে। পাশে বসে আছেন মা মাহেনুর বেগম। কখনো ছেলের কপালে হাত রাখছেন, কখনো চিকিৎসকের খোঁজ নিচ্ছেন। এক বছর ধরে ছেলেকে সুস্থ করতে এ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মা।
গত বছরের ১৭ জুন এক সড়ক দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছে মাইমুলের জীবন। ডান পায়ের হাড় ভেঙে যায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক বছর।
.মাইমুলকে প্রথমে ভর্তি করা হয় বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয়। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে চারটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে সে। কিন্তু জোড়া লাগেনি ভাঙা হাড়, শুকায়নি ক্ষত। এখনো হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে সে।
মাইমুল বর্তমানে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ভর্তি আছে। এর আগে সে ছিল জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। সেখানেই কথা হয় মা মাহেনুর বেগমের সঙ্গে।
মাহেনুরের এখন একটাই স্বপ্ন—ছেলেকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ আটকে আছে অর্থসংকটে। চিকিৎসা চালাতে এত টাকা কোথায় পাবেন—এ চিন্তা নিয়ে মাহেনুর বললেন, ‘ছেলে আমার একমাত্র অবলম্বন। ওর ভরসায় বেঁচে আছি। কিন্তু চিকিৎসার জন্য এত টাকা তো নেই।’
.ভোলার চরসামাইয়া গ্রামের বাসিন্দা মাহেনুরের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন কলেজে রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আর ছেলে মাইমুল পড়ছে বরিশাল সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে।
২০১০ সালে মাহেনুরের স্বামী মারা যান। তখন ছেলে-মেয়ে দুজনই ছিল ছোট। এরপর একাই সংসারের হাল ধরেন তিনি। এলাকার মানুষের কাপড় সেলাই করে যা আয় হতো, তা দিয়েই সন্তানদের বড় করেছেন।
মাহেনুর বলেন, ‘দুইটা নাবালক বাচ্চা রাইখা (ওদের বাবা) চইলা গেল। সেই থেকে একা সংসার চালাচ্ছি। এলাকায় সেলাইয়ের কাজ করে ছেলে-মেয়ে দুইটারে পড়ালেখা করাইছি। এর মধ্যে আল্লাহ এই বিপদ কেন দিল, বুঝি না। সহায়সম্পত্তি যা ছিল, কিছু বন্ধক রাখছি, কিছু বিক্রি করছি।’
ছেলে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হয়নি পরিবারের পক্ষে। একসময় টাকার অভাবে চিকিৎসা থেমে যায়। ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন মাহেনুর।
.সেই সময়টা ছিল আরও কঠিন। বাড়িতে শয্যাশায়ী ছেলের দেখভাল করেছেন তিনি। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেননি।
‘একটা মানুষ ঢাকায় আসলে কত খরচ! প্রতিদিন কতগুলো টাকার ওষুধ লাগে। তখন চিকিৎসা তো আর করাইতে পারলাম না’—আফসোস নিয়ে বলেন মাহেনুর।
মাহেনুর বলেন, গত মে মাসে ছেলেকে নিয়ে আবার বরিশালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। পরে বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু অবস্থার আরও অবনতি হলে ৬ জুন ছেলেকে নিয়ে আবার ঢাকায় আসেন। পরদিন ভর্তি করান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাইমুলের জন্য বিনা মূল্যে শয্যার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষার ফি হাসপাতাল থেকে মওকুফ করা হয়েছে। তবে মাইমুলের হাড়ের চিকিৎসা প্রয়োজন। এ চিকিৎসা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সম্ভব নয়।
.পাঁচ বছর পথে থাকার পর শিশুটি খুঁজে পেল মাকে.জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুব হাসান বলেন, মাইমুলের ভাঙা হাড় এখনো জোড়া লাগেনি। হাড় জোড়া না লাগলে ওপরের ঘা কখনোই ভালো হবে না। এ চিকিৎসা অর্থোপেডিক সার্জনদের করতে হবে।
আর্থিক সংকটের কথা জানানোর পর মাহবুব হাসান বললেন, ‘সে ক্ষেত্রে ওনাদের উচিত নিটোরে নিয়ে রোগীকে ভর্তি করানো। সে ক্ষেত্রে আমরা লিখে দিতে পারি।’
পরে ২১ জুন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ছাড়পত্র নিয়ে মাইমুলকে নিটোরে ভর্তি করান মাহেনুর। এখন সেখানেই চলছে তার চিকিৎসা।
তবে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়ছে খরচের চাপও। মাহেনুরের ভাষ্য, ঢাকায় থাকা-খাওয়া ও ওষুধ মিলে প্রতিদিন এক হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছেন। ছেলেকে সুস্থ করাতে সবার কাছে সহায়তা চান এই মা।
মাইমুলের চিকিৎসায় সহায়তা পাঠানোর ঠিকানা—মাহেনুর বেগম, হিসাব নম্বর ০৩০৪১১০২৫৮৭৩১, সোনালী ব্যাংক, বরিশাল করপোরেট শাখা, রাউটিং নম্বর: ২০০০৬০৩৪৫। বিকাশ নম্বর: ০১৫৩৮৩৯৬১২১ ও নগদ নম্বর: ০১৭২৮৮৭২২৬৬।
.‘মা আমারে ভাত বাইড়া দিবো, এইডা চাইমু’





